দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় সক্ষমতা বাড়লেও বিদেশমুখী মানুষের প্রবণতা কমছে না। বরং বিদেশে চিকিৎসার খরচ মেটাতে বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মাত্র চার বছরের ব্যবধানে বৈধ পথে চিকিৎসার অর্থপ্রবাহ বেড়েছে ৯.৬ গুণ।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে চিকিৎসার জন্য বৈধ পথে পাঠানো হয়েছে তিন কোটি ২৭ লাখ ডলার। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে পাঠানো হয়েছিল মাত্র ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা আরে কমে ১৮ লাখ ডলারে নামে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে হুন্ডি, নগদ বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় বিপুল অর্থ বিদেশে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে সামান্য অংশই ধরা পড়ছে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশি রোগীরা প্রতিবছর বিদেশে চিকিৎসার জন্য চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১১ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্লাস-মাইনাস পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চিকিৎসার জন্য চলে যাচ্ছে। এই বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈধ লেনদেনের তথ্য মিলিয়ে দেখলে বিদেশে চিকিৎসার অর্থপ্রবাহের একটি বড় অমিল সামনে আসে।
বিদেশে চিকিৎসার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়ার ক্ষেত্রে আগে রোগী ও স্বজনদের নানা প্রশাসনিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হতো।
চারটি সমীক্ষায় বিদেশমুখী চিকিৎসার চিত্র : বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ৩২২ ব্যক্তির ওপর করা এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৫১.৫ শতাংশ ভারত, ২০ শতাংশ সিঙ্গাপুর এবং ২০ শতাংশ থাইল্যান্ডে গেছে। অন্যান্য দেশে গেছে প্রায় ১০ শতাংশ রোগী। এসব রোগীর ৫২.৫ শতাংশই গেছে সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। সার্জারির জন্য ২৭.৬ শতাংশ, ক্যান্সার বা টিউমারের চিকিৎসায় ৬.৫ শতাংশ এবং দাঁতের চিকিৎসায় ২.২ শতাংশ রোগী গেছে।
এক হাজার ১৯৬ জন পর্যটকের ওপর পরিচালিত আরেক সমীক্ষায় দেখা যায়, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের মধ্যে হৃদরোগীর হার ১২.২০ শতাংশ। চোখের চিকিৎসায় ১০.৫৩ শতাংশ, কিডনি সমস্যায় ৮ শতাংশ এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় ৭.৫২ শতাংশ রোগী বিদেশে যায়। এ ছাড়া ফ্র্যাকচার, হাড়ের সমস্যা, পেটের রোগ, লিভার, ডায়াবেটিস ও গাইনি সমস্যার চিকিৎসা নিতেও মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছে। এক হাজার ২৭৮ জন পর্যটকের ওপর করা আরেকটি সমীক্ষায় দেখা যায়, বিদেশে গড়ে এক সপ্তাহ অবস্থান করেছে ৩৮ শতাংশ। ৩৫ শতাংশের অবস্থান দুই সপ্তাহ। এক মাস ছিল ৮ শতাংশ, দুই মাস ৫ শতাংশ, তিন মাস ৩ শতাংশ এবং ছয় মাস ২ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ব্যয় চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের বিল ছাড়িয়ে আবাসন ও জীবনযাপনের খরচেও ছড়িয়ে পড়ে।
এক হাজার ১৮১ জন পর্যটকের ওপর আরেক সমীক্ষায় দেখা যায়, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ব্যক্তিদের ২৫ শতাংশ ব্যবসায়ী। বেসরকারি চাকরিজীবী ১২.৫৩ শতাংশ, দিনমজুর ১২ শতাংশ, সরকারি চাকরিজীবী ৯.৪৮ শতাংশ এবং শিক্ষক ৭.৫৩ শতাংশ। এ তালিকায় সাংবাদিক, চিকিৎসক, পুলিশ ও শিক্ষার্থীরাও রয়েছে।
আস্থার সংকটই বড় কারণ : সম্প্রতি বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন এমন চারজন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের ভাষ্য, বাংলাদেশের করপোরেট হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার খরচ বেশি, রোগ নির্ণয় যথাযথ হয় না, চিকিৎসকরা রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন না এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে থাকেন। এসব কারণে দেশের চিকিৎসায় তাঁদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
বরিশাল বিভাগের ভোলার হিরন চন্দ্র সম্প্রতি ভারত থেকে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের উন্নত বেসরকারি হাসপাতালে এর চিকিৎসা থাকলেও বিদেশের তুলনায় খরচ অনেক বেশি। বিশেষ করে এভারকেয়ার হাসপাতাল, সাবেক ইউনাইটেড বর্তমান কন্টিনেটাল হাসপাতালে অনেক বেশি। রাজধানীর দারুসসালাম এলাকার বাসিন্দা সুজিৎ নন্দী লিভারের চিকিৎসা করাতে কয়েকবার বিদেশে গেছেন। প্রতিবারই তাঁর আড়াই থেকে তিন হাজার ডলার খরচ হয়েছে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, বিদেশে ডায়াগনসিস (রোগ নির্ণয়) ভালো, ডাক্তাররা রোগীদের সমস্যার কথা সময় নিয়ে শোনেন, আচরণ ভালো। বাংলাদেশে চিকিৎসাব্যবস্থায় এসবের পরিবর্তন আনতে পারলে রোগীরা বিদেশমুখী হবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, দেশে মানসম্পন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে জটিল রোগের হার কমবে, বিদেশমুখী প্রবণতাও কমবে। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ যথাযথভাবে হয়নি। বিনিয়োগের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ অস্ত্রোপচার ঢাকায় হয়। সারা দেশে প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার ও বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ থাকলে পরিস্থিতি এমন হতো না।