Image description
তোপের মুখে ইউএনওরা

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছে বঞ্চিতরা। কোথাও নিয়োগে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। আবার কোথাও নিয়োগ না পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে তালা দিয়েছে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। বিক্ষোভকারীরা সংশ্লিষ্ট ইউএনওসহ কর্মকর্তাদের অপসারণ দাবি করেছেন। বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ইউএনওদের কেউ কেউ দুর্নীতির মাধ্যমে জামায়াত বা আওয়ামী লীগের কর্মী নিয়োগ দিয়েছেন। আবার কিছু স্থানে নিয়োগবঞ্চিতরা অভিযোগ করেছেন, ইউএনওরা বিএনপি নেতাদের যোগসাজশে দলটির নেতাকর্মী ও তাদের স্বজনদের নিয়োগ দিয়েছেন।

রাজশাহীতে ‘ধর ধর ইউএনও ধর’ স্লোগান

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে বিএনপির নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েছেন অধিকাংশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। রোববার থেকে বিভিন্ন উপজেলায় ফল প্রকাশ হয়। এর পরই বিভিন্ন জায়গায় ইউএনওদের কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মীরা। সোমবারও বাগমারা ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ হয়। নেতাকর্মীর অভিযোগ, প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অন্যদের নিয়োগের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

বাগমারা উপজেলা যুবদল নেতা সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিক্ষোভ সমাবেশে নেতাকর্মীরা ‘ধর ধর ইউএনও ধর, ধরে ধরে জবাই কর’, ‘ইউএনওর চামড়া, তুলে নেব আমরা’ ইত্যাদি স্লোগান দেয়। বিক্ষোভকারীরা দুর্নীতির মাধ্যমে ওই দুই পদে নিয়োগের অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে বাগমারা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন, মন্ত্রণালয়ের গাইডলাইন অনুসরণ করে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। শতভাগ মেধাবীরাই নির্বাচিত হয়েছেন। প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে কোনো দুর্নীতি হয়নি। অন্যদিকে গোদাগাড়ী উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান বিপ্লবের নেতৃত্বে গতকাল গোদাগাড়ী ইউএনও কার্যালয়ের সামনেও বিক্ষোভ হয়। একই দিন তানোর ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ হয়েছে। উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রায়হানুল হকের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা ইউএনও নাঈমা হকের অপসারণ দাবি করেন। তবে ইউএনও নাঈমা হক বলেন, পরীক্ষায় নির্বাচিতদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

পুঠিয়াতেও একই অভিযোগ তুলে সামাজিকমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। বড় নেতাদের সুপারিশের পরও তাদের প্রার্থীরা বাদ পড়ায় তারা ক্ষুব্ধ। পুঠিয়া পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সানোয়ার হোসেন জনি বলেন, ছাত্রদলের পদধারী নেতারা বাদ পড়েছেন। পুঠিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ফ্যাসিস্ট ও জামায়াতের মধ্য থেকে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা গ্রামে গ্রামে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে গণধোলাই দিয়ে বিদায় করবেন।’ এই বিষয়ে পুঠিয়ার ইউএনও লিয়াকত সালমান বলেন, অনেক সুপারিশ ও তবদির ছিল। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। চারঘাটে বিএনপি নেতার দলীয় সুপারিশে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্বাচিত করার অভিযোগ করেছেন বঞ্চিতরা। তারা বলেন, চারঘাটের ইউএনও শতভাগ দলীয়করণ করেছেন প্রার্থী নির্বাচনে। তারা জেলা প্রশাসনের অধীনে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার দাবি করেন। ইউএনও জান্নাতুল ফেরদৌস তাদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানান, প্রার্থী নির্বাচনে মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। সেভাবেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। কোথাও নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিলেটে কার্যালয়ে যুবদল ছাত্রদলের তালা

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা ইউএনওর কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে সোমবার বিক্ষোভ করেছেন উপজেলা যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এর আগে শনিবার রাতে উপজেলার আটটি ইউনিয়নে ৬৯ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৬ জন সুপারভাইজারের চূড়ান্ত তালিকাসহ রিজার্ভ ও অপেক্ষমাণ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হয়। এরপর বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার দেওয়া তালিকার ভিত্তিতে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তারা অবিলম্বে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি করেন। তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে ইউএনও এমদাদুল হক শরীফ বলেন, কোনো নেতার তালিকার ভিত্তিতে নয়, বরং শতভাগ স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগে সিলেটের জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলায়ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

যশোরে ছাত্রদল নেতা ও তার স্বজনদের নিয়োগ, বিক্ষোভ

যশোরের কেশবপুরে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। তাদের দাবি, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়কসহ তার আত্মীয়স্বজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার চাকরিপ্রত্যাশীরা উপজেলা পরিষদে স্মারকলিপি প্রদান, বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। চাকরিপ্রত্যাশীদের একাংশের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন বিএনপি সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে।

বিক্ষুব্ধরা জানান, ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও বিএনপি পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মেধাবীদের মূল্যায়ন করা হয়নি। তারা প্রকাশিত ফলাফল স্থগিত রেখে নিরপেক্ষভাবে পুনরায় খাতা মূল্যায়ন করে নিয়োগের দাবি জানান।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বোরহান উদ্দিন (বৈষমবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী) বলেন, ‘নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে চাপ দেওয়া হয়েছে। আমি ভাইভা পরীক্ষায় ছয়টি প্রশ্নের সবগুলোরই যথাযথ উত্তর দিয়েছি। অথচ আমার নাম ওয়েটিং লিস্টেও নেই।’

নিয়োগপ্রত্যাশীদের বিক্ষোভে সংহতি প্রকাশ করেন কেশবপুর উপজেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী সম্রাট হোসেন, সমন্বয়কারী মাহফুজ হাসান ইমন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিরাজ বিশ্বাস প্রমুখ। সম্রাট হোসেন বলেন, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আজিজুর রহমান নিজেই সুপারভাইজার পদে নিয়োগ পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, তার ভাইবোনকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আজিজুর রহমানের দাবি, ‘নিয়োগ প্রক্রিয়া মেধার ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়েছে। আমি ও আমার ভাই কৃতকার্য হয়েছি। আন্দোলনকারীরা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চায়।’ উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. আব্দুল খালেকের দাবি, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো হক্ষক্ষেপ নেই।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও কর্মী নির্বাচন কমিটির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান বলেন, কেশবপুর উপজেলার তথ্য সংগ্রহকারী পদে ১২৪ (১১ জন রিজার্ভ) জন এবং সুপারভাইজার পদে ১২ জন (১ জন রিজার্ভ) নিয়োগ পেয়েছেন। পরীক্ষায় ৫টি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ড যেভাবে মার্কিং করেছে, সেভাবেই ফল হয়েছে। এখানে দলীয় কোনো প্রভাব পড়েনি।