Image description
 

ভরা বর্ষায় নদ - নদী পানিতে টইটম্বুর , নেই ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞাও । তবু বরিশালে নদ - নদীগুলোতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত রুপালি ইলিশ । যা ধরা পড়ছে , তার বেশির ভাগই ছোট ; দামও চড়া । মৎস্য বিভাগের তথ্যেও মিলছে উৎপাদন কমার চিত্র । বিশেষজ্ঞরা বলছেন , ইলিশের উৎপাদন কমার পেছনে এবার চারটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ — নদী থেকে সাগর পর্যন্ত চলাচলের পথে বাধা , পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া , অবৈধ জাল এবং ট্রলিংয়ে অতিরিক্ত মাছ শিকার ,

মোকামে নিয়ে আসা ইলিশ বাছাই । গত শনিবার বরিশাল পোর্ট রোড মৎস্য মোকামে ।

মাইক্রোপ্লাস্টিকসহ নানা দূষণ । বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী , বিভাগে ইলিশ উৎপাদন তিন অর্থবছর ধরে কমছে । ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন উৎপাদনের পর থেকে প্রতিবছর কমেছে । ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে । ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে নেমে আসে । ইলিশের উৎপাদন

কমে আসায় চিন্তিত মৎস্য সেক্টরের সংশ্লিষ্টরা । মেঘনায় ঘেরা মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়ার জেলে তোফায়েল হোসেন বলেন , ‘ ইলিশের আশায় দাদন নিয়েছিলেন , কিন্তু ভরা বর্ষায় ইলিশ তো নদীতে মিলছে না । যা - ও পাচ্ছি , তা ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের বেশি নয় । ’ বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই , সায়েস্তাবাদে দীর্ঘ বছর ধরে মাছ ধরেন জেলে আবু মিয়া । তিনি বলেন , ‘ জাল ফেললে ইলিশের আশা আজকাল আর করি না । মাছই তো নদীতে নেই । তার ওপর আবার ইলিশ ! ’ ইলিশ গবেষক ড . আনিচুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন , “ গত দুই বছরে ইলিশের মোট উৎপাদন কমে যাওয়া চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে । তার ওপর বড় ইলিশ ধরা পড়ছে না ।

এ ক্ষেত্রে ইলিশ সুষমতা হারাচ্ছে কি না , তা খতিয়ে দেখা দরকার । তিনি মনে করেন , নদ - নদীতে ইলিশ কম ধরা পড়ার অন্যতম কারণ , নদী থেকে সাগর পর্যন্ত ইলিশের চলার পথে বাধা , পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া , অবৈধ জাল ,ট্রলিং বোটে ওভার ফিশিং , মাইক্রোপ্লাস্টিকসহ নানা দূষণ । আনিছুর বলেন , তিনি কয়েকটি মাছঘাট ঘুরে দেখেছেন । এই সময়ে ( আগস্টে ) অন্য বছর যতটা ইলিশ পাওয়া যেত , তার চেয়ে অনেকটা কম । মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন , ‘ ইলিশের ক্ষতিটা ২০১৯ সালের পর থেকে শুরু হয় । 

সাগরে ট্রলিং বোটের আধিপত্য , ভারতের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময়টা আলাদা ছিল বিধায় ইলিশের আদি বাড়ি সাগরে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে । আর নদীতে মাছ না থাকার কারণ হলো , পানির গভীরতা কমে গেছে , ডুবোচরে চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে , তার ওপর নতুন আপদ যুক্ত হয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের চিন্তা । ' বরিশাল পোর্ট রোডের মৎস্য আড়তদার নাসির উদ্দিন বলেন , ‘ মোকামে ইলিশ নেই বললেই চলে । গত শনিবার ১ হাজার ২০০ গ্রামের ইলিশ প্রতি কেজি ৩ হাজার ২৫০ টাকা , এক কেজির ইলিশ ২ হাজার ৭৫৯ টাকা , এলসি ( ৮০০-৯০০ গ্রাম ) ২ হাজার ৬৫৯ টাকা , ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২ হাজার ১৫০ টাকা

এবং জাটকা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে । শনিবার পোর্ট রোডে সর্বোচ্চ ৫০ মণ ইলিশ উঠেছে । ' নাসির বলেন , ‘ নদীর লোকাল মাছ আসছে না । ট্রলিং জালে সাগর মোহনা থেকে ইলিশ ধরে ফেলায় মাছের আকাল হচ্ছে । ' বরিশাল জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড . মো . হাদিউজ্জামান বলেন , ‘ এবার ইলিশের পরিমাণ কম । বৃষ্টি হলেও উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন বাড়েনি । আসলে মাছ সাগর থেকে নদীতে ঢুকতে পারছে না । শুধু অভিযানের ব্যর্থতার দোষ দিয়ে লাভ নেই । আমার উপস্থিতিতে চায়না দুয়ারির মতো অবৈধ জালেও মাছ ধরা পড়েনি । নদীতে মাছ কম , এটাই মূলকথা ।

এর কারণ ইলিশ যাওয়া- আসার পথে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে । ” হাদিউজ্জামান বলেন , ‘ নতুন করে চিন্তার বিষয় হচ্ছে , গবেষণায় মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে । এ জন্য ইলিশের উৎপাদন কমবে , ডিম সময়মতো আসবে না । এমনকি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমবে । ' বরিশাল জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইলিশের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার টন , কিন্তু জুন পর্যন্ত হয়েছে ৩৭ হাজার টন । এটা বাজারের আনুমানিক তথ্য । বাস্তবে আরও কম হতে পারে ।