Image description
পেশাদারত্ব নাকি রাজনৈতিক তকমা

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাধাগ্রস্ত হয় পুলিশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রথম ছয় মাসেও পুলিশ সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। কাজের মূল্যায়নের মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে ভেতরে-বাইরে। ফলে পুলিশের কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক চলছে। তৈরি হয়েছে গভীর সংকটও। শুধু তাই নয়, নিজেদের ওপর অর্পিত ক্ষমতার প্রয়োগ করতে পারছেন না পুলিশ কর্মকর্তরা। নানা বিতর্কের পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না এই বাহিনী। এমন প্রেক্ষাপটে মাঠ পুলিশকে নিয়ে নতুন চিন্তা করছেন নীতিনির্ধারকরা। তারা জানিয়েছেন, পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার, গতিশীল ও জনমুখী হিসাবে গড়ে তুলতে হলে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা বঞ্চিত হওয়ার কার্ড খেলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কর্মকর্তাদের কাজের সঠিক পারফরম্যান্স, সততা ও মাঠপর্যায়ের যোগ্যতাই মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ সদস্যদের মূল্যায়ন ও পদায়নে যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত সততাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তদবির বা কোনো ধরনের অযাচিত প্রভাব যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্ষমতা পরিবর্তনের পর পুলিশ বিভাগে এক শ্রেণির সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) ও সাবেক আইজিপি খোদা বকস চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, যাকে খুশি তাকে ওসি-এসপি পদে পদায়ন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যরা বাদ পড়ছেন। তিনি বলেন, পুলিশ তার নিজের ওপর অর্পিত ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারে না। তিনি বলেন, বিচারক যেভাবে একজন আসামিকে জামিন দিতে পারেন, একজন ওসিও সেভাবে থানা থেকে আসামি জামিন দিতে পারেন। তদন্ত নিষ্পত্তির যথেষ্ট আইনি ক্ষমতা (সিআরপিসি অনুযায়ী) থাকা সত্ত্বেও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় তারা তা স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আমি ডিআইজি এবং আইজিপি থাকা অবস্থায় অনেক ওসিকে সিআরপিসি অনুযায়ী বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে বলেছিলাম। কিন্তু কাউকে দিয়ে সেটি করাতে পারিনি।’

৫ আগস্টের আগে যারা নানা কারণে কোণঠাসা ছিলেন, তারা নিজেদের ‘বঞ্চিত’ দাবি করে ইতোমধ্যে কয়েক ধাপে পদোন্নতি ও সুবিধাজনক পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। বাস্তবে তারা কোন প্রেক্ষাপটে বঞ্চিত ছিলেন এবং বর্তমানে তাদের পারফরম্যান্স কেমন-তার কোনো সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ হচ্ছে না। বঞ্চিত হওয়ার অজুহাতে পদোন্নতি পাওয়ার পর পরবর্তী প্রমোশনের ক্ষেত্রেও একই অজুহাত দেওয়া হচ্ছে। অথচ কাজে তাদের দৃশ্যমান কোনো পারফরম্যান্স নেই। তাদের লবিং ও সুবিধাবাদী অবস্থান নেওয়ার কারণে যোগ্য কর্মকর্তারা পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেঙে পড়া কাঠামো পুনর্গঠনে ১৩ অক্টোবর উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। যেখান থেকে বাহিনীতে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের নির্দেশনা আসতে পারে। নিয়োগ, বদলি এবং পদায়নেও আসতে পারে নতুন নির্দেশনা। শুধু কনস্টেবল এবং এএসপি ছাড়া অন্যান্য পদে সরাসরি নিয়োগ না দেওয়ার প্রস্তাব আসতে পারে। এএসপি পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, তারা সবাই যাতে পদোন্নতি পেয়ে অন্তত ডিআইজি হতে পারেন সেই ব্যবস্থা রাখার চিন্তা-ভাবনা করছেন দায়িত্বশীলরা। তারা জানিয়েছেন, থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসাবে বতর্মানে পুলিশ পরিদর্শকরা দায়িত্ব পালন করলেও এএসপিদের সেখানে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব থাকতে পরে।

সূত্র জানায়, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় চাকরিরত কনস্টেবলদেরও গ্র্যাজুয়েশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে। এ ক্ষেত্রে এসআই হিসাবে পদোন্নতি পাওয়ার পরই তাদের পাঠানো হবে একাডেমিতে। সেখানে ৩ বছর মেয়াদি গ্র্যাজুয়েশন কোর্স সম্পন্ন করার পর এক বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ হবে। এরপর এসআই হিসাবে কর্মজীবন শুরু করবেন।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিকবার ওসি হিসাবে এএসপিদের দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফের একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার কারণ জানাতে চাইলে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, থানার ওসির ক্ষমতা অনেক। কিন্তু সে অনুযায়ী যোগ্য লোক পাওয়া যায় না। অযোগ্যরা ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করায় পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একজন বিসিএস কর্মকর্তাকে ওসির দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি শুরুতেই ঘুস খাবেন বলে মনে হয় না। কারণ, তার টার্গেট থাকবে অনেক উপরে। তিনি ডিআইজি, অতিরিক্ত আইজিপি-এমনকি আইজিও হতে চাইবেন। তাই তারা কাজের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সতর্ক থাকবেন। বর্তমান ব্যবস্থাপনায় যারা ওসি (পরিদর্শক পদমর্যদা) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন, তারা কনস্টেবল বা এসএআই হিসাবে চাকরি জীবন শুরু করেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই পদই তাদের সর্বোচ্চ পদ। তাই পদের প্রভাব খাটিয়ে তাদের অনেকেই আখের গোছানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান।

জানতে চাইলে পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, ৫ আগস্টের সংকটময় পরিস্থিতিতে পুলিশ পুনর্গঠনে কার কী অবদান ছিল তার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা জরুরি। নতুন পরিস্থিতিতে পুলিশ যখন মনোবল হারিয়ে ভেঙে পড়েছিল, তখন এক শ্রেণির কর্মকর্তা বাহিনী পুনর্গঠনে কাজ না করে বিভিন্ন দপ্তর ও দরবারে তদবিরে ব্যস্ত ছিলেন। অভ্যুত্থান পরবর্তী আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার (ময়নুল ইসলাম ও মাইনুল হাসান) পরিবর্তনের পর যে নতুন সেটআপ তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে বিতর্কিত ভূমিকা ও স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সহযোগী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। ওই সেটআপের মধ্যে যারা নির্বাচন প্রলম্বিত করতে চেয়েছিল তারাও এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। পুলিশ সদর দপ্তর এবং ডিএমপিতে যারা প্রকারান্তরে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তাদের কেউ কেউ এখনো বহাল রয়েছেন।

একজন ডিআইজি যুগান্তরকে বলেন-ডিবি, এসবি ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এখনো সাবেক বিতর্কিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিশ্বস্ত অনুসারীরা অবস্থান করছেন। তারা পুরো বাহিনীর চেইন অব কমান্ড বিনষ্টের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উসকানি দিচ্ছেন। এছাড়া কোনো সুনির্দিষ্ট ফিটলিস্ট তালিকা বা নীতিমালা ছাড়াই ওসি ও এসপি পদে পদায়ন করায় পুলিশ প্রশাসনে নিচের লেভেলে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ হচ্ছে না। পুলিশের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দূর করতে এবং নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে পেশাদার মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা অপরিহার্য। তার আশঙ্কা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পেশাদারত্বের ভিত্তিতে পদায়ন করা না হলে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়বে।