Image description
১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাশের হার

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ওপর ইংরেজি ও গণিতের ধাক্কা লেগেছে। যে কারণে পাশের হার গত বছরের তুলনায় কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। আওয়ামী সরকারের ১৬ বছরের তুলনায় যা সর্বনিম্ন। এবার দেশের ১১ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে ফেল করেছে ২৭ শতাংশ এবং গণিতে ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ দুই বিষয়ে ফেলের হার গত বছরের চেয়েও বেশি। পাশাপাশি ৯টি সাধারণ বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগে ১৯, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে প্রায় ৩৬ এবং মানবিক বিভাগে ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এর প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলের ওপর।

সোমবার সকালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি, মাদ্রাসা বোর্ডের দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ও দাখিলসহ (ভোকেশনাল) ১১ বোর্ডের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন। এর মধ্যে পাশ করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। পাশের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ শিক্ষার্থী। অন্য বছরের তুলনায় পাশের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে এবার। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন শিক্ষার্থী। সে হিসাবে জিপিএ-৫ কম পেয়েছে ১৯ হাজার ৯ জন। তবে এবারও মেয়েরা আগের বছরের চেয়ে বেশ ভালো করেছে। তাদের পাশের হার প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১ হাজার ১১৬ জন বেশি। এবার পাশের হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। পিছিয়ে মাদ্রাসা বোর্ড। এতে পাশের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা স্মরণকালের সবচেয়ে খারাপ ফল।

সোমবার সকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পরীক্ষার ফল হস্তান্তর করেন। ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। একই সময়ে স্ব স্ব শিক্ষা বোর্ড ফল প্রকাশ করে। শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় ও নিজ শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে ফল সংগ্রহ করে। অনুষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কেন এই ফল বিপর্যয় : শিখন ঘাটতি, বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন, ইংরেজি, গণিতসহ বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা এবং অনেক বছর পর পরীক্ষায় কঠোর মনিটরিং-এসব কারণে পাশের হার কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া দীর্ঘদিন চলা পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া বা পাশের হার বাড়ানো থেকে বেরিয়ে এসেছে সরকার। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা যথাযথ মূল্যায়নের নির্দেশনা ছিল বোর্ড থেকে। এটাও ফলের ওপর প্রভাব পড়েছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে পাশের হার প্রায় শতভাগ। বিপরীতে ইংরেজি ও গণিতে পাশের হার নেমে এসেছে ৭০ শতাংশের ঘরে। এছাড়া মানবিক বিভাগ থেকে এবার ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে। পাশ করেছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৪ জন। এ বিভাগে পাশের হার ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ ফেল করেছে ৫১ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২ লাখ ১৯ হাজার ৬৯৬ জনের মধ্যে পাশ করেছে ১ লাখ ৪১ হাজার ২৪৮ জন। এ বিভাগে পাশের হার ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, মাধ্যমিকের শুরুতেই করোনার কারণে দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতি তৈরি হয়। এরপর ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে থাকা শিক্ষার্থীদের নতুন কারিকুলামের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চাপ এবং দশম শ্রেণিতে উঠে আবার আগের ধারার কারিকুলামে ফিরে আসায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের শিক্ষাগত পরিবর্তন তৈরি হয়। এর সঙ্গে পরীক্ষার হলে প্রথমবার সিসিটিভি ক্যামেরাসহ কঠোর নজরদারি এবং মূল্যায়নে কড়াকড়িও ফলে প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও শিক্ষার প্রকৃত মান যাচাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে বাস্তবসম্মত করতে এই কড়াকড়ি করা হয়েছে বলে জানান তারা।

ফল বিশ্লেষণে পাশের হার কমে যাওয়ার পেছনে আরও দুটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। এর একটি হচ্ছে, মানবিক বিভাগে পাশের হার মাত্র ৪৯ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাশের হার মাত্র ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ, মানবিকে ৫১ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় প্রায় ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এ দুই বিভাগের ফল সার্বিক পাশের হারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অপর কারণ হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের তুলনামূলক খারাপ ফল হওয়া। এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাশ করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। সর্বনিম্ন পাশের হার মাদ্রাসা বোর্ডে, যা মাত্র ৫৬ শতাংশ। এর পরে রয়েছে ময়মনসিংহ বোর্ড, যেখানে পাশের হার মাত্র ৫৭ শতাংশ। এছাড়া দিনাজপুর, কারিগরি ও সিলেট বোর্ডে পাশের হার মাত্র ৫৮ শতাংশ। ফেল করা এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই গ্রামের এবং সুবিধাবঞ্চিত অভিভাবকের সন্তান। সেখানে দক্ষ ও মানসম্মত এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের বড় ঘাটতি রয়েছে।

সাধারণ ৯ শিক্ষা বোর্ডের ফল : এসএসসি ৯টি সাধারণ বোর্ডের পাশের হার ৬৪.০৫ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন। এর মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাশের হার ৭১.৬৩, জিপিএ-৫ ৩৩২৫৩ জন; রাজশাহীতে পাশের হার ৬৩.৬৭, জিপিএ-৫ ১৬১১৩ জন; কুমিল্লায় পাশের হার ৬৫.৪২, জিপিএ-৫ ৯৮১৪ জন; যশোরে পাশের হার ৬৬.২৭, জিপিএ-৫ ১১৪৭৮ জন; চট্টগ্রামে পাশের হার ৫৯.৪৮, জিপিএ-৫ ৯৩৯৮ জন; বরিশালে পাশের হার ৬০.৩৫, জিপিএ-৫ ২৭৭৮ জন; সিলেটে পাশের হার ৫৮.৩৩, জিপিএ-৫ ৩৮৩৬ জন; দিনাজপুরে পাশের হার ৫৮.০৫, জিপিএ-৫ ১৩৬৩৯ জন এবং ময়মনসিংহে পাশের হার ৫৭.৩৯, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৭০০ জন। ঢাকা বোর্ডের অধীনে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে ঢাকা মহানগরী। এখানে ৯৯ হাজার ২০২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮২ হাজার ৭৭৯ জন পাশ করেছে। পাশের হার ৮৩.৪৪। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরী থেকেই সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৩৮৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডে পাশের হার : মাদ্রাসা বোর্ডে পাশের হার ৫৫.৪৯। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৫৮.২০। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন।

ফলে খুশি শিক্ষামন্ত্রী : শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফলের বিষয়ে বলেন, এবার খুব সুন্দর একটা ফল হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়েছে। এবার আইনগতভাবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। যদি কোনো শিক্ষার্থীকে ভুল নম্বর দেওয়া হয়ে থাকে বা প্রাপ্য নম্বর না দেওয়া হয় তবে সেসব উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। রিভিউ কমিটি সেই খাতা পুনর্মূল্যায়ন করবে।

উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন মাহ্দী আমিনের : প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন ভালো ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, যারা ভালো ফল করেছে, তাদের পাশাপাশি তাদের পরিবারও গর্বিত। কোনো কারণে যারা কাঙ্ক্ষিত বা প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি, তাদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এটাই জীবনের শেষ সুযোগ নয়। যারা কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি, সরকার সব সময় তাদের পাশে থাকবে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই, ভবিষ্যতেও যেন তারা সব বাধা পেরিয়ে সফলতা অর্জন করতে পারে।

সর্বশেষ ১৬ বছরের সর্বনিম্ন ফল : ২০০৯ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৬৭.৪১ শতাংশ। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশের হার এক লাফে ১৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। সে বছর গড় পাশের হার ছিল ৮০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ৮০ শতাংশের ওপর পাশের হার দেখা যায়। ২০১১ সালে পাশের হার দাঁড়ায় ৮২.১৬, ২০১২ সালে ৮৬.৩৭, ২০১৩ সালে ৮৯.৩৪, ২০১৪ সালে ৯১.৩৪, ২০১৫ সালে ৮৭.০৪, ২০১৬ সালে ৮৮.৭০, ২০১৭ সালে ৮০.৩৫, ২০১৮ সালে ৭৭.৭৭, ২০১৯ সালে ৮২.২০, ২০২০ সালে ৮২.৮৭, ২০২১ সালে ৯৩.৫৮ (করোনার বছরে অটোপাশ), ২০২২ সালে ৮৭.৪৪, ২০২৩ সালে ৮০.৩৯, ২০২৪ সালে ৮৩.০৪ এবং ২০২৫ সালে পাশের হার ছিল ৬৮.৪৫ শতাংশ। ১৬ বছর আগেই সেই ফলাফলের আবর্তে ফিরেছে এসএসসির ফল।

চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২১ এপ্রিল। পরীক্ষা শেষ হয় ২০ মে। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৬৯টিতে শতভাগ শিক্ষার্থী পাশ করেছে। অন্যদিকে ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাশ করতে পারেনি। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২২৬টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শতভাগ পাশের প্রতিষ্ঠান কমেছে ৩১৫টি। শূন্য পাশের প্রতিষ্ঠান বেড়ে হয়েছে ৩১২টি।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার আড়াই মাস পর এই ফল প্রকাশ করা হয়।

এসএসসির ফল চ্যালেঞ্জ আজ থেকে : চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কেউ কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে সে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন বা খাতা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। এ কার্যক্রম শুরু হবে আজ থেকে, চলবে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত।