Image description

অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতকে বিপর্যয়কর অবস্থায় রেখে ক্ষমতা ছেড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে গতিশীল, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত এবং স্থিতিশীল করতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অতীতে অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড এবং সাবেক বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফয়জুল কবির খান বিশেষ মহলকে সুবিধা দেয়ার ফলে তৈরি হওয়া ভঙ্গুর অবস্থা কাটিয়ে উঠতে এবং গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

সরকারের নেয়া প্রধান পদক্ষেপসমূহÑ অপচয় রোধ, উৎপাদন বাড়ানো ও স্বচ্ছতা আনতে বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বহুমুখী উৎস থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ আমদানির চেষ্টা চলছে। অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের ভঙ্গুর অবকাঠামো ঠিক করতে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে এই বার্তা দিয়েছেন যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সমস্যা মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আগের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার দেশ ও দেশের মানুষকে এই সংকট থেকে রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং টেকনাফের আলীখালীতে ২০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তির এই দুই প্রকল্প জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রামপাল মৈত্রী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে উৎপাদনে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। এ সময়ের মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) মধ্যেও প্রথম।

বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৭০ কোটি ঘনফুট। তাই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে কমপক্ষে দুই হাজার মেগাওয়াট। দেশের সব গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে তিন হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। অথচ সক্ষমতা আছে ১০ হাজার মেগাওয়াটের। তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন হচ্ছে দুই হাজার মেগাওয়াটের মতো। অথচ উৎপাদনের সক্ষমতা হচ্ছে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

আদানি ছাড়া কয়লা সংকট এবং যান্ত্রিক কারণে বড়পুকুরিয়া, বরিশাল ইলেকট্রিক কোম্পানি, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার এবং আরএনপিএলের কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। এর মধ্যে পায়রার একটি ইউনিট গত রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। সেটি আবার সেই রাতে চালু হয়েছে। এ কারণে পায়রায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের ক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন হয়েছে ৭১০ মেগাওয়াট। ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্র যান্ত্রিক সক্ষমতা দুর্বল। তাই এর দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হচ্ছে এক হাজার ১৬৫ মেগাওয়াট। এসএস পাওয়ারের কয়লার দাম বাড়িয়ে দেয়ার পরও এর দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হচ্ছে এক হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট। এর উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। 

পতিত সরকারের শেষ সময়ে দেশে দৈনিক গড় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি বলা হয়েছিল। আর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে ১২৫টি। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১৫ বছরে অন্তত ১৫ বিলিয়ন ডলার অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ২০২১ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আরো ২৪ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এসব বিনিয়োগ পরিকল্পনা ছিল প্রধানত উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি বা বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের চুরি, অপচয় এবং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই বর্তমান বিএনপি সরকারের ভর্তুকির ওপর বিশাল আর্থিক চাপ পড়েছে। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল বিএনপি সরকার। তখন প্রতি ১০০ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের বিলের দাম দুই টাকা ১৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে আড়াই টাকা করা হয়। 

আর ৩০১-৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে কমানো হয়। এ শ্রেণির ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি তিন টাকা ৩০ পয়সা থেকে কমিয়ে তিন টাকা করা হয়। সেই সময় কিছু পরিবেশবাদীর এবং ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের কারণে বিএনপি সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে হোঁচট খায়। গত ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তা বেড়েছে ১৮৮ শতাংশ। এ সময়ের মধ্যে গত দেড় দশকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ১৪ বার। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি বাড়িয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ওই বছরের জানুয়ারিতে ৫ শতাংশ হারে দুই দফা এবং ফেব্রুয়ারিতে এক দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সরকার। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আরেক দফা ৫ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। 

চলমান প্যাকেজের আওতায় ঋণ দেয়ার সময় সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারকে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি থেকে পর্যায়ক্রমে বেরিয়ে আসার শর্ত দিয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ। গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে অভাবনীয় হারে। অন্তর্বর্তী সরকারের এক সিদ্ধান্তে থমকে যায় প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারের ৩১টি প্রকল্প। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে প্রকল্পগুলো আবার সচল করার চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টের একটি রায়ের ব্যাখ্যা সামনে এনে প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ট-এলওআই বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। 

এতে তিন হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল উদ্বেগ। পতিত সরকারে আমলে নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা দেয়া ও অপরিকল্পিত নানা কর্মকাণ্ডের ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সমস্যা তৈরি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফওজুল কবির খান। তার সময়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকট শুরু করেছেন। নিজের লোকজনকে বিদ্যুৎ খাতে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অবস্থায় দেশকে পেয়েছে। নানা সংকট কাটিয়ে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণে ইতোমধ্যে আমরা নানা কাজ শুরু করেছি। 

পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে যেন গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকট থেকে মানুষকে ধীরে ধীরে বের করে আনা। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে তিন হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা ব্যবস্থাপনার আওতায় মার্চের জন্য দুই হাজার ৬৭ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। এছাড়া বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরে বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ নানা কৃত্রিম সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে রাজধানীসহ সারাদেশে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুতের লোডশেডিং করতে শুরু করেছে।

গত শনিবার জাতীয় সংসদের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, অতীতে একটি নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা দেয়া ও অপরিকল্পিত নানা কর্মকাণ্ডের ফলে এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সমস্যা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার দেশ ও দেশের মানুষকে এই সংকট থেকে রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, যান্ত্রিক ত্রুটির সমাধান শেষে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মধ্যে গ্যাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সঞ্চালন শুরু হয়ে গেলে আস্তে আস্তে আমাদের যেখানে প্রেসার কমে গেছে, প্রেসারটা উন্নত হবে। লোডশেডিং নিয়ে মন্ত্রী বলেন, স্বাভাবিকভাবে গ্যাস না থাকলে মানুষও পাবে না, আমার পাওয়ার স্টেশনও পাবে না। এখন আমার যে পাওয়ার স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে, ওগুলো আবার চালু করব।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইটারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এম শামসুল আলম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ বৈষম্যের শিকার। বিদ্যুতের বাজার অসম। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ডেভেলপ করা হয়নি। বাজার অসম রাখা হয়েছে। সেখানে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার। সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে সরকারের পলিসি এবং ফসিল ফুয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রধান্য দিয়ে ভর্তুকিতে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। 

প্রাথমিক জ্বালানি ও গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা ও গ্যাস আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ভারতের আদানি গ্রুপসহ বাইরের উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়া এবং গরমের কারণে হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে কিছুটা বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। 
বিদ্যুতের সংকট সৃষ্টির কারণ গ্যাসের অভাব : দেশের বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসনির্ভর হওয়ায় পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে সেগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। কয়লা সংকট : কিছু কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার স্বল্পতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

উৎপাদন ঘাটতি ও লোডশেডিং : চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা কারণে কিছুটা লোডশেডিংয়ের দেখা দিয়েছে। কয়লা এবং গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস। তাই লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হচ্ছে। এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে তিন হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। কিন্তু রোববার বিকাল ৩টায় লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি এবং দেশের সব বিতরণ কোম্পানি। অভিযোগ আছে অনেক এলাকায় সারাদিন রাতে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। পিডিবির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতি আগে খুব বেশি হয়নি। শ্রাবণ মাস দেশজুড়ে গরম থাকে তেমনভাকে কিছুটা লোডশেডিংয়ের দেশের অন্যতম বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রামপাল বন্ধ ও চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

যান্ত্রিক ত্রুটি এবং কয়লার অভাবে গেল এক বছরে ৩০ বার বন্ধ হয়েছে এর কোনো-না-কোনো ইউনিট। এ কারণে বাগেরহাটের রামপালের বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল) নিয়ে মহাবিপাকে সরকার। বিপুল অঙ্কের বিদেশি ঋণে নির্মিত কেন্দ্রটি এমন বেহাল হওয়ায় খোদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও সচিব গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এক বৈঠকে এর কারণ জানতে চান রামপাল কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামানাথ পূজারীর কাছে। তিনি বলেন, এভাবে একটি কেন্দ্র চললে সরকারের কোনো ভাবমর্যাদা থাকবে না। কয়েক মাস ধরে সারা দেশে ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে। এ সময় রামপালের মতো কয়লাভিত্তিক মূলধারার বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু থাকার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রামপাল কেন্দ্র বারবার বন্ধ হয়েছে। ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১৩২০ মেগাওয়াটের (৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট) এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর তিন বছরের মধ্যে মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটিতে চিন্তায় পড়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কারণ, এ কেন্দ্রের জন্য ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে ১৬০ কোটি ডলার। এখন সেই টাকা শোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে শেরপুরের বিআর পাওয়ার জেনের ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পটুয়াখালীতে চীনা অর্থায়নে নির্মিত আরপিসিএল ও নরিনকো পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি লিমিটেড বা আরএনপিএলের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র। রামপাল গত অর্থবছরে রেকর্ড আট হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যা আগের বছরে ছিল পাঁচ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিট। রামপাল কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ পিডিবি-বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ে ১৪ টাকার বেশি। অথচ সরকার বিক্রি করে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা। বাকি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়। সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, রামপাল কেন্দ্রকে অন্যান্য বেসরকারি কেন্দ্রের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। 

বর্তমানে রামপাল কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও), হেড অব প্ল্যান্টসহ ১২ ভারতীয় এই কেন্দ্রে কর্মরত আছেন। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি সিএফও এবং মহাব্যবস্থাপক-জিএমসহ ৯ জন ভারতীয় এই কেন্দ্র থেকে কোনোরকম অনুমতি না নিয়ে ভারত থেকে চলে যান। এতে বিপাকে পড়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী সময়ে সরকার তাদের আর গ্রহণ করেনি। পরে অন্য কর্মকর্তাদের পাঠায় ভারতের এনটিপিসি। ৫০-৫০ শতাংশ করে এই কেন্দ্রের মালিকানা হচ্ছে ভারত ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন এবং বাংলাদেশের পিডিবির। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, কয়লা এবং গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। 

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস। তাই লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হচ্ছে। এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু রোববার বিকাল ৩টায় লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি এবং দেশের সব বিতরণ কোম্পানি। অভিযোগ আছে, অনেক এলাকায় সারাদিন রাতে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিডিবির কর্মকর্তারা ইনকিলাবকে বলেন, বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতি আগে খুব বেশি হয়নি। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবির হিসাব অনুযায়ী, গত রোববার বিকাল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। 

কিন্তু সরবরাহ হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। বিকাল ৫টায় এই সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াটে ঠেকেছে। এর পরও লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট। পিডিবি থেকে জানা গেছে, আদানির সরবরাহ হঠাৎ করে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। সাধারণ পিক আওয়ারে এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট দেয়া হলেও রোববার বিকাল ৫টায় দেয়া হয়েছে ৮১৫ মেগাওয়াট। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আদানি কয়লা পরিবহন করতে পারছে না। এ কারণে কয়লার মজুদও কমে গেছে। তাই তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বলে পিডিবিকে জানিয়েছে। তবে তাদের এ তথ্য কতটুকু সত্য তা যাচাই করতে পারেনি পিডিবি।

আদানি ছাড়া কয়লা সংকট এবং যান্ত্রিক কারণে বড়পুকুরিয়া, বরিশাল ইলেকট্রিক কোম্পানি, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার এবং আরএনপিএলের কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। এর মধ্যে পায়রার একটি ইউনিট রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। সেটি রাতে চালু হয়েছে বলে জানা গেছে। এ কারণে পায়রায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের ক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন হয়েছে ৭১০ মেগাওয়াট। ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্র যান্ত্রিক সক্ষমতা দুর্বল। তাই এর দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হচ্ছে এক হাজার ১৬৫ মেগাওয়াট। এসএস পাওয়ারের কয়লার দাম বাড়িয়ে দেয়ার পরও এর দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হচ্ছে এক হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট। অথচ এর উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৭০ কোটি ঘনফুট। তাই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে কমপক্ষে দুই হাজার মেগাওয়াট। গতকাল বিকাল ৫টায় দেশের সব গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে তিন হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। অথচ সক্ষমতা আছে ১০ হাজার মেগাওয়াটের। তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন হচ্ছে দুই হাজার মেগাওয়াটের মতো। অথচ উৎপাদনের সক্ষমতা হচ্ছে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। গ্যাস সংকটের কারণে কমপক্ষে দুই হাজার এবং কয়লা সংকট ও অন্যান্য কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো উৎপাদন কমেছে স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে এক হাজার মেগাওয়াট। মূলত এ তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতি।

ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে : গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন ধরে গেলে গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট কমে যায়। এ কারণে সারা দেশে গ্যাস সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুতের উৎপাদন অনেক কমে যায়। সে টার্মিনাল মেরামতের পর ৫ আগস্ট রাতে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। রোববার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়েছে ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। যা আগে দেয়া হতো ১১০ কোটি ঘনফুট। সব কিছু ঠিক থাকলে সোমবার রাত ১১টার পর এক্সিলারেট এনার্জি পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারে। তবে তা নিশ্চিত নয়। তখন দেশে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুটে গিয়ে দাঁড়াতে পারে।

শামসুল হক শারেক, কক্সবাজার থেকে জানান, কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল এখন শুধু পর্যটনের জন্যই নয়; বরং দেশের জ্বালানি অর্থনীতিরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং টেকনাফের আলীখালীতে ২০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তির এই দুই মেগা প্রকল্প দেশের জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে অনন্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। 

মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বঙ্গোপসাগরের তীরে গড়ে উঠেছে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিটের মোট এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) অধীনে নির্মিত এই কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বর্তমানে জাতীয় গ্রিডের চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সরবরাহ। তবে এই বিশাল আকৃতির কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কয়লার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। দুটি ইউনিট সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টন কয়লা প্রয়োজন হয়। কয়লা আমদানি, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, জাহাজ ও বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের ওপর এই কেন্দ্রের উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নির্ভরশীল। 

পাশাপাশি, কয়লাভিত্তিক হওয়ায় এর পরিবেশ ও ছাই বা অ্যাশ ম্যানেজমেন্টের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালী এলাকায় গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রায় ৮৭ হাজার সৌর প্যানেলের মাধ্যমে সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে এই কেন্দ্র থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে, যা সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকদের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের বড় সুবিধা হলোÑ এতে কয়লা, গ্যাস বা তেল পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না, ফলে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এটি পুরোপুরি সূর্যের আলো-নির্ভর হওয়ায় রাতে উৎপাদন বন্ধ থাকে এবং মেঘলা আবহাওয়া বা বর্ষার দিনে উৎপাদন কিছুটা কমে যায়।

মাতারবাড়ীর কয়লাভিত্তিক বড় বেসলোড বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং টেকনাফের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের এই উপস্থিতি কক্সবাজারকে দেশের জ্বালানি মানচিত্রে এক বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমে বড় আকারের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারÑ এই দুইয়ের মেলবন্ধন দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের অবদান রাখছে।

এস এম শামসুর রহমান ও আমানুল হক নান্টু বাগেরহাট থেকে জানান, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার সর্বোচ্চ সময়েও প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে রামপাল মৈত্রী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। জাতীয় গ্রিডে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং শিল্প ও আবাসিক খাতে নিরবচ্ছিন্ন বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহে কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক উৎপাদনের অংশ হিসেবে পঞ্চমবারের মতো এক মাসে ৭০০ মিলিয়ন ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে এই কেন্দ্রটি। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক জিএম তরিকুল ইসলাম জানান, গত দুই মাসে প্রায় আট লাখ টন কয়লা খালাস করা হয়েছে এবং বর্তমানে কেন্দ্রে প্রায় দুই লাখ টন কয়লার মজুদ রয়েছে, যা আসন্ন রমজান মাসেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে। অত্যাধুনিক ‘আলট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তি এবং উন্নত পরিবেশগত মানদ- বজায় রেখে পরিচালিত এই কেন্দ্রটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরো সুদৃঢ় করছে।

রিয়াদুল ইসলাম রিয়াদ, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) থেকে জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হলেও চট্টগ্রামের বাঁশখালী এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়মিত এক হাজার ২৫০ থেকে এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে। প্ল্যান্টের চিফ কো-অর্ডিনেটর প্রকৌশলী মো. ফয়জুর রহমান জানান, গত তিন মাস ধরে কেন্দ্রটি টানা পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদনে থাকলেও স্থানীয় বাঁশখালী ও আশপাশের এলাকায় তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ বাঁশখালী জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. আতিকুর রহমান জানান, উৎপাদিত সমস্ত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে চলে যাওয়ায় এবং কেন্দ্রের পাশে কোনো গ্রিড সাবস্টেশন না থাকায় স্থানীয় এলাকাবাসী এর পূর্ণ সুফল পাচ্ছে না।

এম এ জলিল সরকার, দিনাজপুর (পার্বতীপুর) থেকে জানান, দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে দুটি ইউনিট দিয়ে কোনোমতে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। যান্ত্রিক ত্রুটি ও ওভারহোলিংয়ের (মেরামত) অভাবে কাক্সিক্ষত উৎপাদন মিলছে না। বর্তমানে কেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে ২২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও ঘাটতি রয়েছে ১৫০ মেগাওয়াট। প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানিয়েছেন, ১ নম্বর ও ৩ নম্বর ইউনিট আংশিক চালু রয়েছে এবং ২০২০ সাল থেকে বন্ধ থাকা ২ নম্বর ইউনিটটি মেরামতের কাজ শেষে ভবিষ্যতে চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।

জাকির হোসেন, পটুয়াখালী থেকে জানান, পটুয়াখালী জেলায় পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র (এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট), আরএনপিএল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র (এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট) এবং পায়রা ইউনাইটেড পাওয়ার প্ল্যান্ট (১৫০ মেগাওয়াট) এই তিন কেন্দ্র মিলিয়ে মোট দুই হাজার ৭৯০ মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে চলে যাওয়ায় এবং সেখান থেকে রেশনিং করায় পটুয়াখালীর স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এদিকে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্ল্যান্ট ম্যানেজার প্রকৌশলী শাহ আবদুল হাসিব জানান, পায়রা বন্দরের নাব্য সংকটের কারণে মাদার ভেসেল সরাসরি জেটিতে ভিড়তে না পারায় কুতুবদিয়া থেকে লাইটার জাহাজে করে কয়লা আনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ ও সময় দুটোই বাড়লেও বর্তমানে প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টন কয়লা মজুদ রয়েছে।