বিয়ে ও প্রেমের সম্পর্ক প্রলোভনে বাংলাদেশি নারীদেরকে বিদেশ পাচাররে অভিযোগ বাড়ছে। বিশেষ করে চীনা নাগরিকদের সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের সম্পর্ক তৈরি করে নারীদের চীনে নেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় গত কয়েক মাসে ছয় চীনা নাগরিক গ্রেফতার হয়েছেন। পাশাপাশি ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনরে প্রলোভনে কম্বোডিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশেও নারী পাচারের ঘটনা সামনে এসেছে।
অভিবাসন-সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। ব্র্যাকের তথ্য অনুয়ায়ী গত সাত বছরে নির্যাতন শোষণ ও প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় ৭০ হাজার নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন।
ভাষ্য অনুয়ায়ী, তাদের বড় একটি অংশ বিদেশ থেকে নির্যাতন, নানা ধরনের শোষণের শিকার হয়েছেন।
প্রেম ও বিয়ের ফাঁদ : ২০২৪ সালের ৭ নভম্বের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্যান গোউয়ে ইয়াং জিকু নামে দুই চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ, রানী আক্তার ও মালিনা মারাক নামে দুই নারীকে প্রেম ও বিয়ের সম্পর্কের মাধ্যমে চীনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তারা। বিমানবন্দরে ঐ দুই নারী চীনে যেতে অস্বীকৃতি জানালে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে। এর পর ২০২৫ সালের ২৮ মে একই অভিযোগে আরো দুই চীনা নাগরিক হু জানজুন ও জিয়াং লিজি একই ধরনের অভিযোগে গ্রেফতার হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদেশি নাগরিকরা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রামের নারীদের সঙ্গে পরিচিত হন। কয়েক মাস যোগাযোগের পর বাংলাদেশে এসে পরিবারের আস্থা অর্জন করেন। এর পর বিয়ের মাধ্যমে তাদের বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে নেওয়ার পর নারীদের বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
চাকরির প্রলোভনে পাচার : সমপ্রতি কম্বোডিয়া থেকে ফিরে এক নারী বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছেন।তার অভিযোগ, মাসে এক লাখ টাকা বেতনে কাস্টমার কেয়ারে চাকররি কথা বলে তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। এ ঘটনায় রাজবাড়ীর মো. রুবলে, ফরিদপুরের আনিসুর রহমান ও গাজীপুরের বেলাল হোসেনের নাম এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়ার জন্য ঐ নারীর কাছ থেকে প্রায় চার লাখ টাকা নেওয়া হয়। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও ডলার নিয়ে নেওয়া হয় এবং পরে তাকে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে নির্যাতন ও অনৈতিক কাজে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। পরে তিনি পালিয়ে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েল ফেয়ার সেন্টারের সহায়তায় দেশে ফেরেন।
প্রায় একই সৌদি আরবেও চাকরির প্রলোভনে গিয়ে এক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাকে আটকে রেখে মারধর, খাদ্যবঞ্চনা ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা :ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের অনেকেই নির্যাতন, শোষণ বা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান জানিয়েছেন, বিদেশি নাগরিক পরিচয় ও উদ্দেশ্য যাচাই করা জরুরি। বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারীদের দ্রুত আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রেম বিয়ে কিংবা চাকরির প্রলোভনে নারী পাচার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দূতাবাস ও অভিবাসন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদেশে যাওয়ার আগে ভিসা, চাকরি নিয়োগদাতা ও বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে নারীদের সচেতন করাও জরুরি।