পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার অটো ডিজঅ্যাবল (এডি) সিরিঞ্জ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর (ডিজিএফপি)। এরই মধ্যে দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে। তবে এর মধ্যেই দরপত্রের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন বা প্রযুক্তিগত বিবরণ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। নথি বলছে, নির্দিষ্ট একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজটি পাইয়ে দিতে দরপত্রের স্পেসিফিকেশন বদলে ফেলা হয়েছে। এমন কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যার কারণে অধিকাংশ দেশি ও বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এডি সিরিঞ্জ কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ এই প্রথম নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দরপত্র প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। সেবার দরপত্রের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনে স্পষ্টভাবে ‘ফিক্সড নিডল উইথ প্রটেক্টিভ ক্যাপ’ সরবরাহের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু চীনের আনহুই টিয়ানকাং মেডিকেল টেকনোলজির সরবরাহ করা এডি সিরিঞ্জে নিডলটি ফিক্সড ছিল না। তবুও অধিদপ্তর ওই সিরিঞ্জ গ্রহণ করে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ট্রেডমার্ক সংবলিত ওই এডি সিরিঞ্জ কালবেলার হাতেও এসেছে।
জানা গেছে, সমাপ্ত চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচির অধীনে অপরিহার্য পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার অসমাপ্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এ দরপত্রের আওতায় ১, ৩, ৫ ও ১০ মিলিলিটারের ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার এডি সিরিঞ্জ কেনা হচ্ছে। ইনজেকশনের মাধ্যমে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে অটো ডিজঅ্যাবল সিরিঞ্জ কেনা হয়। কারণ এই সিরিঞ্জ একবার ব্যবহারের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকেজো হয়ে যায়। এ জন্য গত ২৫ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডি-২২ প্যাকেজে (টেন্ডার আইডি: ১২৭৩১৪৪) দরপত্র আহ্বান করা হয়। আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে আগ্রহীদের দরপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের সরবরাহকারীকে কাজটি পাইয়ে দিতে দরপত্রের কারিগরি মানদণ্ড বা টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন বদলে দেওয়া হয়েছে। এতে করে দরপত্রে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারছে না। গত ৩০ জুন প্রকল্পের প্রাক-দরপত্র সভায় সম্ভাব্য দরদাতারা স্পেসিফিকেশন পরিবর্তনের বা সহজ করার অনুরোধ জানালে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। প্রকল্প পরিচালক এ এফ এম আরাফাত হোসেনের সই করা কার্যবিবরণীতে স্পষ্ট বলা হয়, কোনো সংশোধন বা ‘অ্যামেন্ডমেন্ট’ ইস্যু করা হবে না।
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একই ধরনের ক্রয়ের তুলনায় এবারের দরপত্রে সিরিঞ্জের কারিগরি মানদণ্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে সিরিঞ্জের দৈর্ঘ্য, ব্যারেলের ব্যাস, প্লাঞ্জারের দৈর্ঘ্যসহ বিভিন্ন মাপ অত্যন্ত নির্দিষ্ট করে দেওয়ায় বাজারে থাকা অধিকাংশ প্রস্তুতকারকের পণ্য আর শর্ত পূরণ করছে না।
দরপত্রের স্পেসিফিকেশন সংশোধনের দাবি জানিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, স্পেসিফিকেশন সর্বজনীন বা জেনারালাইজড করা হলে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। অধিকসংখ্যক যোগ্য প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে। সরকার আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য কিনতে সক্ষম হবে এবং সরকারের অর্থ সাশ্রয় হবে।
তবে ডিজিএফপি বলছে, এসব স্পেসিফিকেশন ব্যবহারকারীর প্রয়োজন, কার্যকরী চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রণয়ন করা হয়েছে।
চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল যন্ত্রাংশ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান মেসার্স জসিম সার্জিক্যালের স্বত্বাধিকারী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এবারের অটো ডিজঅ্যাবল (এডি) সিরিঞ্জের দরপত্রে এমন কিছু টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন দেওয়া হয়েছে, যা দেখে আমাদের মনে হচ্ছে, নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে বিবেচনায় রেখেই এটি তৈরি করা হয়েছে। গত ১৫ বছর ধরে একই ধরনের স্পেসিফিকেশনে এডি সিরিঞ্জ কেনাকাটা হয়ে আসছে। কিন্তু এবার স্পেসিফিকেশনে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার কারণে অধিকাংশ প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারীর দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে কেন্দ্র করে নয়, বরং বাজারে বিদ্যমান অধিকাংশ মানসম্মত পণ্যের উপযোগী করে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করা হোক। এতে বেশিসংখ্যক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। প্রতিযোগিতা বাড়লে সরকার আরও কম দামে মানসম্মত এডি সিরিঞ্জ কেনার সুযোগ পাবে এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয় হবে।’
জেএমআই সিরিঞ্জ অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর গত অর্থবছরেও অটো ডিজঅ্যাবল সিরিঞ্জ কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল। সে সময় টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন ছিল জেনারেলাইজড ও সর্বজনীন। ফলে জেএমআইসহ অসংখ্য প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারী দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। আমরা গত বছর কাজটি না পেলেও দরপত্রের স্পেসিফিকেশন নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না, কারণ সেটি ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাবের সময়ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে আমরা শুধু লিখিত অনুরোধের ভিত্তিতে কার্যাদেশের বাইরেও অটো ডিজঅ্যাবল সিরিঞ্জ সরবরাহ করেছি। তাই আমরা মনে করি, জনস্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট এমন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দরপত্রের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন অবশ্যই সর্বজনীন ও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া উচিত। এতে বেশিসংখ্যক যোগ্য প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরকারও সর্বোচ্চ সুবিধাজনক দামে পণ্য কেনার সুযোগ পাবে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকল্পের পরিচালক এ এফ এম আরাফাত হোসেনকে ফোন করা হলে এবং খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, বেশ কয়েকজন সরবরাহকারী দরপত্রের স্পেসিফিকেশন সংশোধনের জন্য লিখিতভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে সব ধরনের বিধিবিধান মেনেই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যাদের স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে দরপত্রের স্পেসিফিকেশন মিলছে না, তারা এ বিষয়ে আবেদন করতেই পারেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। কাউকে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়।
দরপত্র প্রক্রিয়ায় পিপিআর ও টেন্ডার স্ট্যান্ডার্ড ডকুমেন্টস অনুসরণ করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নির্ধারিত গাইডলাইন রয়েছে এবং সেই গাইডলাইন অনুসরণ করেই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যারা অভিযোগ করেছেন, তাদের বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী ১০ আগস্টের আগেই সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। এরপরও যদি দরপত্র-সংক্রান্ত বিষয়টির সমাধান না হয়, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এক বছরের ব্যবধানে স্পেসিফিকেশন বদল: তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের টেন্ডার (আইডি: ১০০২৯১৩) এবং বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টেন্ডারের কারিগরি স্পেসিফিকেশনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের দরপত্রে সিরিঞ্জের স্পেসিফিকেশন তুলনামূলকভাবে সাধারণ বা সর্বজনীন ছিল। ফলে দেশীয় ও বিদেশি অধিকাংশ সরবরাহকারী এতে অংশ নিতে পেরেছিল। কিন্তু এবারের দরপত্রে সিরিঞ্জের বিভিন্ন অংশের দৈর্ঘ্য, ব্যাস ও গঠনগত মাপ অত্যন্ত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান দরপত্রে ১০ মিলিলিটার সিরিঞ্জের মোট দৈর্ঘ্য ১৫৬±৪ মিলিমিটার, প্লাঞ্জারের দৈর্ঘ্য ১০১±৩ মিলিমিটার এবং ব্যারেলের বাইরের ব্যাস ১৬.৬±১ মিলিমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে ১ মিলিলিটার এডি সিরিঞ্জের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১ মিলিলিটার সিরিঞ্জের সুচের মাপ ২২জি থেকে ২৩জি করা হয়েছে। মোট দৈর্ঘ্য, ব্যারেলের দৈর্ঘ্য এবং ব্যাসেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের টেন্ডারে যেখানে সুচের মাপ ছিল ২২জি × ১" (০.৭ × ২৫ মিমি), সেখানে এবার তা পরিবর্তন করে ২৩জি × ১" (০.৬ × ২৫ মিমি) করা হয়েছে।
এ ছাড়া সিরিঞ্জের মোট দৈর্ঘ্য ১২০ ± ৩ মিলিমিটার থেকে বাড়িয়ে ১৪০ ± ৫ মিলিমিটার করা হয়েছে। ব্যারেলের দৈর্ঘ্য ৭১ ± ৪ মিলিমিটার থেকে পরিবর্তন করে ৯০ ± ৫ মিলিমিটার করা হয়েছে। ব্যারেলের ভেতরের ব্যাস ১০ ± ১ মিলিমিটার থেকে কমিয়ে ৪.৫ ± ০.৫ মিলিমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সিরিঞ্জগুলোর মধ্যে ১ মিলিলিটার এডি সিরিঞ্জ মূলত ডিপো মেড্রোক্সিপ্রোজেস্টেরন অ্যাসিটেট (ডিএমপিএ-আইএম) নামের জন্মনিয়ন্ত্রণ ইনজেকশন প্রয়োগের কাজে ব্যবহার করা হবে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে এ ইনজেকশন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য সেবা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৩ মিলিলিটার সিরিঞ্জের জন্য মোট দৈর্ঘ্য ১৩১.৫ ± ২.০ মিলিমিটার এবং ব্যারেলের বাইরের ব্যাস ১১.৩০ ± ০.৫ মিলিমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫ মিলিলিটার সিরিঞ্জের জন্য মোট দৈর্ঘ্য ১৩৯ ± ৫ মিলিমিটার এবং প্লাঞ্জারের দৈর্ঘ্য ৮৫ ± ৩ মিলিমিটার চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চলতি দরপত্রে নতুন করে বলা হয়েছে, সরবরাহ করা পণ্য অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পারফরম্যান্স কোয়ালিটি সেফটি (পিকিউএস) ক্যাটাগরি ই০০৮/ই০১৩ তালিকাভুক্ত হতে হবে।
দরপত্রের শর্তানুযায়ী, দরদাতাকে গত পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত ৬ কোটি টাকার সিরিঞ্জ সরবরাহের অভিজ্ঞতা এবং ৮ কোটি টাকার নগদ সম্পদ থাকতে হবে।
সরবরাহকারীদের অভিযোগ, নতুন শর্তগুলো কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তুতকারকের পণ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। কারণ এ ধরনের নির্দিষ্ট মাপ বাজারে প্রচলিত নয়। ফলে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কেনা হবে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার সিরিঞ্জ: দরপত্র অনুযায়ী, ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার পিস এডি সিরিঞ্জ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১ মিলিলিটার এডি সিরিঞ্জ ১ কোটি ২৫ লাখ পিস, ৫ মিলিলিটার এডি সিরিঞ্জ ৮ লাখ পিস, ১০ মিলিলিটার এডি সিরিঞ্জ ২ লাখ পিস এবং ৩ মিলিলিটার এডি সিরিঞ্জ (ডেক্সামেথাসন ইনজেকশনের জন্য) ৬০ হাজার পিস।