দেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ প্রায় ১০ মাস অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। এরই মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা পড়লেও কোনো প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত লাইসেন্স পায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আবেদন মূল্যায়নের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও বিদ্যমান ব্যাংক খাতের সংকটের কারণে নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে মতভেদ তৈরি হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, মূল্যায়ন শেষে আগামী দু-এক মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হতে পারে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ, আমানত সংকটের কারণে বর্তমানে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি অধিকাংশ ব্যাংকই চরম সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু ব্যাংক নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। কয়েকটি ব্যাংক বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের চাপে এতটাই দুর্বল যে, আমানতকারীদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির (প্রভিশন) ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় নতুন করে ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হবে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ এর মতো।
একাধিক আবেদনকারী কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কালবেলাকে জানান, ডিজিটাল ব্যাংকের আবেদনের পর প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবেদনকারীদের কোনো নতুন তথ্য দেয়নি। আদৌ চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে কি না, এ বিষয়েও অন্ধকারে রয়েছেন তারা। জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও গভর্নরের পরিবর্তন হয়েছে। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এ ইস্যুতে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন কি না, সে বিষয়েও অন্ধকারে রয়েছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ কালবেলাকে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে ডিজিটাল ব্যাংক বা অন্য কোনো ধরনের ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হলে দেশের অর্থনীতির জন্য খুব বেশি সুফল বয়ে আনবে না বলে মনে করি।
তার মতে, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হলেও যদি তারা পর্যাপ্ত গ্রাহক না পায়, আয় করতে ব্যর্থ হয় এবং লোকসানে পড়ে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ আরও বলেন, বর্তমানে নতুন ব্যাংক নয়; বড় প্রয়োজন সংকটে থাকা বিদ্যমান ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করা। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত দেশগুলোয় ডিজিটাল ব্যাংক সফলভাবে পরিচালিত হলেও বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই এ ধরনের ব্যাংক চালুর আগে দেশের বাস্তবতা ও প্রস্তুতি বিবেচনা করা জরুরি।
এ ছাড়া ডিজিটাল ব্যাংক নিয়ে আগের সরকারের নেওয়া উদ্যোগও পুনর্মূল্যায়নের পরামর্শ দেন তিনি। ঢাবির এই শিক্ষক বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়ছে, মুনাফা কমছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রেটিং অবনতি হচ্ছে। তাই নতুন কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার আগে বিস্তৃত গবেষণা, পূর্বাভাস ও বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ডিজিটাল ব্যাংকের আবেদন গ্রহণ করে পরে প্রয়োজন নেই—নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন বক্তব্যেরও তীব্র সমালোচনা করেন শহিদুল ইসলাম। তার ভাষায়, আবেদন আহ্বান করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ফি নেওয়ার পর যদি বলা হয় এই ব্যাংকের প্রয়োজন নেই, তাহলে এর জবাবদিহি থাকা উচিত। কারণ, এ ধরনের সিদ্ধান্ত খেয়ালখুশিমতো নেওয়া হলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়। অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। যার বেশিরভাগই এখন চরম সংকটে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ বেড়েছে। ভবিষ্যতে কোনো নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা মালিকানার পরিবর্তে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান এবং আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলেও পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।
তবে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান। কালবেলাকে তিনি বলেন, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত হলে তা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তার আশা, আগামী দুই মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য ১২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ব্রিটিশ বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি, ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান-ডিকে, আমার ডিজিটাল ব্যাংক-২২ এমএফআই, ৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি, বুস্ট-রবি, আমার ব্যাংক (প্রস্তাবিত), অ্যাপ ব্যাংক-ফার্মারস, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক-বাংলালিংক অ্যান্ড স্কয়ার, মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি, উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক, মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক-আকিজ এবং বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক।
২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। শুরুতে আবেদনের শেষ সময় ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর। পরে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে ২ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ১২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন জমা দেয়।
আবেদনকারীদের নির্ধারিত প্রস্তাবপত্রের সঙ্গে ৫ লাখ টাকা (অফেরতযোগ্য) ফি জমা দিতে হবে। এ টাকা যে কোনো তপশিলি ব্যাংক থেকে ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুকূলে দিতে বলা হয়। শর্ত পূরণ না করলে আবেদন বাতিল হবে বলেও নির্দেশনায় জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া আবেদনপত্র সরাসরি জমা দেওয়ার পাশাপাশি ই-মেইলের মাধ্যমেও সব নথি জমা দিতে হবে।
এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় ৫২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের বিশেষ অনুরোধে নগদ ও কড়ি নামে দুটি ডিজিটাল ব্যাংককে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হলেও অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন ওঠায় সেই প্রক্রিয়া বাতিল করেন সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
তারও আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের ১৪ জুন ডিজিটাল ব্যাংক পরিচালনার নীতিমালা জারি করে। পরে নীতিমালা সংশোধন করে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রচলিত ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই মূলধনের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা।
ওই নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো শাখা, উপশাখা, এটিএম, ক্যাশ ডিপোজিট মেশিন (সিডিএম) কিংবা ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) থাকবে না। সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ফলে গ্রাহক সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টাই লেনদেন করতে পারবেন। ডিজিটাল ব্যাংকগুলো ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোড এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন পেমেন্ট সেবা দিতে পারবে। তবে তারা কোনো প্লাস্টিক ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করতে পারবে না। প্রয়োজনে গ্রাহকরা অন্য ব্যাংকের এটিএম বা এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নগদ লেনদেন করতে পারবেন।
ডিজিটাল ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংক আমদানি-রপ্তানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারবে না। বড় ও মাঝারি শিল্পে ঋণ দেওয়ারও অনুমতি থাকবে না। তাদের কার্যক্রম মূলত ব্যক্তি গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ ও খুচরা ঋণসেবায় সীমাবদ্ধ থাকবে। এ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিটি ডিজিটাল ব্যাংককে শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনতে হবে। আইপিওর মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক বিনিয়োগের সমান বা তার বেশি হতে হবে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা সম্প্রসারণে ডিজিটাল ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সুশাসন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ওপর।
নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবার আগে প্রয়োজন অর্থনৈতিক ও আর্থিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি তপশিলি ব্যাংকগুলোকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো ব্যাংকিং কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে হবে।
তিনি মনে করেন, বর্তমানে কিউআর কোডসহ বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আলাদাভাবে নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করি না। বরং বিদ্যমান ব্যাংকগুলোকে আরও উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের ডিজিটাল কার্যক্রম আরও জোরদার করে এবং গ্রাহকদের আধুনিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে আলাদা করে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তৌফিক আহমদ চৌধুরী আরও বলেন, ব্যাংকিং কার্যক্রম আরও ডিজিটাল হলে লেনদেনের খরচ কমে আসবে। আর মানুষের মধ্যে আর্থিক সচেতনতা বা ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বাড়ানো গেলে তারা স্বাভাবিকভাবেই ডিজিটাল লেনদেনের দিকে ঝুঁকবে। এ জন্য মানুষকে আলাদাভাবে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করার প্রয়োজন হবে না; বরং আর্থিক শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোই হবে সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ।