Image description
সরেজমিন জেআইসি-

বাইরে থেকে দেখলে আর দশটি সাধারণ সামরিক স্থাপনার মতোই। অথচ ঢাকা সেনানিবাসের ভিতরে ডিজিএফআই সদর দপ্তরের দক্ষিণ পাশে, মেস-বি সংলগ্ন পুরোনো এ ভবনের নিচেই ছিল ‘জেআইসি’ (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার) নামের এক বন্দিশালা। ভবনটির ভিতরে প্রবেশ করে কয়েকটি সেল পেরোলেই চোখে পড়বে বড় সাইজের একটি সেল। ঠিক তার উল্টো পাশেই একটি রুমের ওপরে লেখা ‘মেডিকেল রুম’। রুমের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের দেয়ালে লম্বালম্বিভাবে কাটা অনেকগুলো দাগের দেখা মিলল। এই দাগের নিচে ও ওপরে বাংলা ও ইংরেজিতে কিছু লেখা। তবে ওপরে নতুন রং থাকায় ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছিল না লেখাগুলো। একই রুমের উত্তর-পশ্চিম কোণের দেয়ালের মাঝামাঝি জায়গায় সাদা রঙের নিচে খোদাই করে লেখা ‘মায়া’। গতকাল সরেজমিন ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত এই বন্দিশালার এমন চিত্র দেখা গেছে।

এদিন বেলা ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার ও অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে জেআইসি পরিদর্শন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। এ সময় তাঁরা জেআইসির ২৬টি সেল ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ ঘুরে দেখেন। পরিদর্শন শেষে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘জেআইসি মানুষকে ধরে এনে বন্দি রেখে তাদের ওপর অত্যাচার এবং নির্যাতন করার একটা সেল। সেখানে কী অমানবিকভাবে বন্দিদের ধরে এনে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর রাখা হয়েছে। 

সেই নির্মম চিত্র এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে কিছুটা অনুভব করা গেছে।’ এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ডিজিএফআইয়ের এই গোপন বন্দিশালায় নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি আরও বলেন, টিএফআই ও জেআইসি সেলের সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের অনেককেই বিচারের আওতায় আনা হয়েছে এবং তাদের বিচার চলছে। ভবিষ্যতেও যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদেরও এই অমানবিক ঘটনার জন্য বিচারের সম্মুখীন করা হবে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি অমানবিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিল। যেখানে কিছু সংখ্যক অতি উৎসাহী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সরকারের কিছু অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এই আয়নাঘর নামে টর্চার সেলগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের নেতা, যারা মতপথের ভিন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাদের ধরে এনে গুম করা হয়েছে। সেই গুমের অনেক ভিকটিমদের এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আলামত নষ্টের বিষয়ে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর নতুন করে রং করে দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় সিমেন্ট দিয়ে এবড়োখেবড়ো করে ওয়ালগুলো নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, অনেক বন্দিরা সেখানে লিখে রাখতেন। সেসব লেখাগুলো নষ্ট করা হয়েছে।

এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, পরিদর্শনে এই বন্দিশালায় যা দেখা গেছে এবং সাক্ষীদের জবানবন্দিতে যা এসেছে, তার মধ্যে ফারাক আছে। নিজেদের ক্লায়েন্টরা এই বন্দিশালার ঘটনায় জড়িত না বলেও দাবি করেন তারা। জেআইসির ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিন আসামির পক্ষে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা জেআইসি পরিদর্শন করেছি। তবে আবদুল্লাহিল আমান আযমী ট্রাইব্যুনালে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে কোনো কিছুরই মিল পাওয়া যায়নি। এই পরিদর্শনের মাধ্যমে তিনি মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়েছেন।’

পরিদর্শনের সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, জহিরুল আমিন, ব্যারিস্টার শাইখ মাহদী, এস এম তাসমিরুল ইসলাম। আর আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু, ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ, ব্যারিস্টার মাহিন রহমান এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। এর আগে গত ১ আগস্ট আয়নাঘর হিসেবে পরিচিত র‌্যাবের টিএফআই সেল পরিদর্শন করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা।

পরিদর্শনে যেমন দেখা গেল জেআইসি : ‘জেআইসি’খ্যাত দ্বিতল ভবনটির ভিতরে একটু এগোতেই চোখে পড়ে একসময়ের বন্দিশালার কাঠামোর নানা চিহ্ন। ভবনের সাধারণ সেলগুলোর কোনো জানালা নেই। কোথাও এক সেলে দুটি, কোথাও একটি এক্সাস্ট ফ্যানের ব্যবস্থা দেখা গেছে। প্রতিটি সেলেই দুই ধরনের দরজা রয়েছে। একটি কাঠের দরজা, অন্যটি লোহার শিক দিয়ে তৈরি। ভবনের তিনটি স্থানে রয়েছে একাধিক করে টয়লেট ও গোসলখানা। বাইরে থেকে যেন কিছুই বোঝা না যায় সেভাবেই তৈরি করা হয়েছিল সেলগুলোর কাঠামো। সাধারণ সেলগুলোর পাশাপাশি দুটি অপেক্ষাকৃত বড় কক্ষ দেখা গেছে। 

প্রসিকিউশনের তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বড় এসিযুক্ত সেলে সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহহিল আমান আযমী ও অন্যটিতে বিএনপি (বর্তমান সংসদ সদস্য) নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে রাখা হয়েছিল। এগুলো ‘ভিআইপি সেল’ নামে পরিচিত ছিল বলে জানায় প্রসিকিউশন। এ ছাড়া সরেজমিন পরিদর্শনে ভবনটির বিভিন্ন স্থানে বন্দিশালার দেয়াল, দরজা, জানালাসহ সামগ্রিক কাঠামো অনেকাংশে নষ্ট করে ফেলার চিত্র স্পষ্ট। কোথাও নতুন রং করা, আবার কোথাও ভেঙে ফেলা হয়েছে কাঠামো। প্রসিকিউশনের দাবি, মামলার আলামত ধ্বংস করতেই ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তড়িঘড়ি করে এখানে নানা ধরনের পরিবর্তন করা হয়।