দেশের একমাত্র দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) টানা পাঁচ মাসের বেশি কার্যত নেতৃত্বহীন। চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের পর এখনো নতুন কমিশন গঠন করতে পারেনি সরকার। ফলে নতুন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান, মামলা দায়ের, আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল, সম্পত্তি জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মতো কমিশনের অনুমোদননির্ভর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। এ অবস্থায় দুদক কমিশন নিয়োগে বাধা কোথায়, এমন প্রশ্ন এখন সরকারের ভিতরে-বাইরে।
জানা গেছে, দুদকের শূন্য নেতৃত্ব থাকাবস্থায় ৮ হাজারের বেশি দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় ৪ হাজারের বেশি নথি ও ফাইল আটকে আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদক কার্যকর না থাকার সুযোগ নিচ্ছেন দুর্নীতিবাজরা। তারা নির্বিঘ্নে আগের মতো ঘুষ-দুর্নীতি অব্যাহত রেখেছেন। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আগে যারা ঘুষ খেত, তারা এখনো একইভাবে সুযোগ খুঁজছে এবং ভালো উদ্যোগও আটকে দিচ্ছে। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, প্রশাসনের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি।
যদিও তিনি সরাসরি দুদকের নিয়োগ নিয়ে মন্তব্য করেননি, প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়ে তার এ বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ৪ আগস্ট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠানে গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, দুদকে কমিশন নিয়োগ দিতে পারছেন না কেন। এর পেছনে বাধা কোথায়। দুদকের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় বর্তমানে চার হাজারের বেশি ফাইল আটকে রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি নতুন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও কমিশন না থাকায় সেগুলো প্রকাশ্য অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা যাচ্ছে না। একইভাবে শেষ হওয়া বহু অনুসন্ধান ও তদন্তের প্রতিবেদনও অনুমোদনের অভাবে ঝুলে আছে। ফলে শুধু নতুন অভিযোগ নয়, পুরোনো গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর বিচারিক অগ্রগতিও থমকে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি নানা প্রতিষ্ঠানে ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে একমাত্র পাহারাদার হলো দুদক। এটি না থাকাতে সেসব অনিয়ম দুর্নীতির নির্ভয়ে ইচ্ছামতো চলছে। কারণ কমিশন না থাকায় সেসব ক্ষেত্রে দুদক অভিযানও চালাতে পারছে না।
দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশনের অনুমোদন ছাড়া নতুন অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা, চার্জশিট, সম্পত্তি জব্দ বা বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। যদিও আইনে কমিশন শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নতুন কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কমিশন গঠন না হলে করণীয় সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়নি। আইনের এ শূন্যতাই বর্তমানে পুরো প্রতিষ্ঠানকে কার্যত অচল করে রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দুদকের কর্মকর্তারা জানান, বিভাগীয় পরিচালক ও মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ে অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত থাকা অসংখ্য ফাইল কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে নতুন অনুসন্ধানের অনুমোদন, তদন্ত প্রতিবেদন, মামলা দায়ের, আদালতে চার্জশিট দাখিল, সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা। দুদক সূত্র জানায়, গত ৩ মার্চ চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার একযোগে পদত্যাগ করার পর থেকেই কমিশনের শীর্ষ পদগুলো শূন্য রয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর চেয়ারম্যান হিসেবে আবদুল মোমেন এবং কমিশনার হিসেবে সাবেক জেলা জজ মির্জা মুহাম্মদ আলী আকবর আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ নিয়োগ পেয়েছিলেন। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও তারা দায়িত্ব পালন করেন প্রায় ১ বছর ২ মাস।
দুদকের কমিশন শূন্য হওয়ার প্রায় চার মাস পর গত ২২ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নুরুল ইসলাম, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। তারা বিজ্ঞপ্তিতে দিয়ে দুদকে দায়িত্ব পেতে আগ্রহীদের জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করে। মোট ৩২৭ জনের একটি তালিকা পায় সার্চ কমিটি। কমিটি তাদের জীবনবৃত্তান্ত বিশ্লেষণ করে ১২ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করেছে বলে জানা গেছে।
যাচাইবাছাই শেষে তাদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান ও দুজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জমা পড়া জীবনবৃত্তান্তের মধ্যে বিচার বিভাগ, প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সংখ্যাই ছিল বেশি। চেয়ারম্যান পদে বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম এখন আলোচনায় রয়েছে। সাবেক একজন বিচারক, সাবেক একজন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, প্রশাসন ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা এবং বর্তমানে একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত একজনের নামও রয়েছে আলোচনায়।
জানা গেছে, ১২ জনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান, ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর সাবেক বিচারক মো. মোতাহার হোসেন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. বদিউর রহমান এবং ভূমি ভবনের পরামর্শক খালেকুজ্জামান আলোচনায় রয়েছেন। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মঈদুল ইসলাম মনে করেন, কমিশন না থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছেন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা।
তিনি বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত আটকে গেলে সময়ের সুবিধা নেন অভিযুক্তরা। অনেকে অবৈধ সম্পদ বিক্রি বা অন্যের নামে হস্তান্তর করে ফেলেন। আবার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামতও নষ্ট হয়ে যায়। এতে মামলার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কমিশন গঠনে বাধা কোথায় তা সরকারই বলতে পারবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশন নিয়োগে দীর্ঘ বিলম্বের ব্যাখ্যা সরকারকেই দিতে হবে। তবে তাঁর পর্যবেক্ষণে দুটি বিষয় প্রধান- আমলাতান্ত্রিক কায়েমি স্বার্থ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতিজনিত দীর্ঘসূত্রতা।
তিনি বলেন, স্বাধীন, দক্ষ ও সৎ নেতৃত্বের অধীনে দুদক কার্যকরভাবে কাজ করলে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত অংশ জবাবদিহির মুখে পড়তে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সংশোধিত ধারাগুলোই বহাল থাকবে, যতক্ষণ না সংসদ নতুন আইন করে সেগুলো পরিবর্তন বা বাতিল করে। এ নিয়ে ২০১৬ সালে আপিল বিভাগ (গড়ঁফঁফ অযসবফ াং ঝঃধঃব, ৬৮ উখজ (অউ) ১১৮) এই ব্যাখ্যাই দিয়েছে। অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হলেও তার মাধ্যমে আইনে যুক্ত হওয়া সংশোধন টিকে থাকে। তবে যেসব অধ্যাদেশ পুরোনো আইন পুরোপুরি বাতিল করে নতুন আইন এনেছে, সেগুলো কার্যকারিতা হারালে পুরোনো আইন নিজে থেকে ফিরে আসে না; নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত সেখানে আইনি শূন্যতা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ দুদক আইনের সংশোধনের ক্ষেত্রে আগের আইনে ফিরে যায়নি; সংশোধিত বিধানই বর্তমানে কার্যকর রয়েছে, যদি না সংসদ নতুন আইন করে তা পরিবর্তন করে।
এদিকে দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশনের অনুমোদন ছাড়া নতুন অনুসন্ধান, তদন্ত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। যদিও আইনে কমিশন পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে নতুন কমিশন গঠনের কথা বলা রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না হলে কী হবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই।