ক্লান্ত দূর করে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে নির্মিত দূরপাল্লার ট্রাকচালকদের চারটি বিশ্রামাগার উদ্বোধনের পর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় খালি অবস্থায় পড়ে আছে। মহাসড়কে চালকদের দুর্ভোগ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে ২২৭ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হয়। গত তিন বছর আগে এর নির্মাণ শেষ হয়। এর অবস্থান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার নিমসার, সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়া, হবিগঞ্জের জগদীশপুর এবং মাগুরার লক্ষ্মীকান্দর। এতে রয়েছে শোয়ার ঘর, গোসলখানা, ক্যানটিন, চিকিত্সাকক্ষ, ওয়ার্কশপ, ওয়াশ জোন, গাড়ি পার্কিং, নামাজের স্থান, বিনোদনকেন্দ্র ইত্যাদি সুবিধা।
সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, নিজস্ব জনবল দিয়ে এসব বিশ্রামাগার পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আবার ওঅ্যান্ডএম পদ্ধতিতে পরিচালনার জন্যও কোনো সার্ভিস প্রোভাইডার পাওয়া যায়নি। তাই ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইজারাদার পেলেই এগুলো চালু করা সম্ভব হবে।
চালকরাই জানেন না : সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, কিন্তু যাদের জন্য তৈরি এসব বিশ্রামাগার, তাদের অনেকেই জানে না, এর অবস্থান কোথায়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কুমিল্লার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের নিজস্ব জনবল দিয়ে নিমসার বিশ্রাগারটি চালুর উদ্দ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক দিন চালু রাখার পর পরই তা বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ প্রচারণর অভাব। দেখা গেছে, কোনো দিন এক-দুই জন চালক বিশ্রাম নিয়েছে। কোনো দিন কোনো চালকই আসেনি।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর খান বলেন, কয়েক মাস আগে কুমিল্লার নিমসার বিশ্রামাগারটি চালুর আগে কর্তৃপক্ষ আমাদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরির্দশন করেছিল। পরবর্তী কার্যক্রম আমাদেরকে আর জানানো হয়নি। তিনি বলেন, চারটি বিশ্রামগার চালুর আগে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন রয়েছে। কারণ আমাদের দেশের চালকরা বিশেষ করে ট্রাকচালকরা রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে বিশ্রামে অভ্যস্থ। ফলে বিশ্রামাগার নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো আগ্রহ তৈরি হয়নি। ফলে প্রচারণার ওপর জোর দিতে হবে।
বিশ্রামের নির্ধারিত ফি : বিশ্রামাগারে দূরপাল্লার ট্রাকচালকদের রাতে থাকা এবং অন্যান্য সেবা নেওয়ার জন্য কিছু ফিদিতে হবে। যানবাহন পার্কিং, বিশ্রামকক্ষ ও শৌচাগার ব্যবহারের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। অতি পণ্যবাহী মোটরযানের ক্ষেত্রে পার্কিং ফি হবে প্রথম পাঁচ ঘণ্টার জন্য ১৫০ টাকা এবং এরপর প্রতি ঘণ্টায় ৩০ টাকা। ভারী পণ্যবাহী গাড়ির জন্য প্রথম পাঁচ ঘণ্টার ফি ১০০ টাকা, এরপর প্রতি ঘণ্টায় ২০ টাকা। মাঝারি পণ্যবাহী যানের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচ ঘণ্টার জন্য ৭৫ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি ঘণ্টায় ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর হালকা শ্রেণির পণ্যবাহী গাড়ির জন্য প্রথম পাঁচ ঘণ্টায় ৫০ টাকা এবং এরপরের প্রতি ঘণ্টার জন্য ১০ টাকা দিতে হবে। বিশ্রামকক্ষ ব্যবহারের জন্য প্রথম পাঁচ ঘণ্টার ভাড়া ১৫০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি ঘণ্টার জন্য ৩০ টাকা দিতে হবে। টয়লেট ব্যবহার ফি ৫ টাকা, গোসল ১০ টাকা। টয়লেট ও গোসলখানা একসঙ্গে ব্যবহার করলে ১৫ টাকা দিতে হবে।
কেন প্রয়োজন বিশ্রামাগার : সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী একজন চালকের একটানা ৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো নিষেধ। এরপর অন্তত আধ ঘণ্টা বিশ্রাম দিয়ে আবার সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা গাড়ি চালানো যাবে। দিনে আট ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানোও নিষিদ্ধ। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। বড় পণ্য বা যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালে চালক বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তার মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়ার গতি কমে যায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাতের বেলা ও দীর্ঘ রুটে এমন হয়।
এ ব্যাপারে পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘বিশ্রামাগার পরিচালনার জন্য টেন্ডারপ্রক্রিয়া এখন চলমান। এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারব।