বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার সন্ধ্যা নদীর ফেরিঘাটসংলগ্ন এলাকায় জেগে উঠেছে নতুন এক চর। কিন্তু এ উপজেলায় বিএস জরিপ না হওয়ার সুযোগে ভুয়া ওয়ারিশ তৈরি করে পুরো চরের জমি নামজারি করাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই চরের ২৫টি দাগে (এসএ) জমি রয়েছে প্রায় ১৫ একর, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি দাগ এখনো নদীর মধ্যে। ওই জমির পুরোটার মালিকানা হিন্দু সম্প্রদায়ের।
বানারীপাড়া ফেরিঘাটসংলগ্ন সন্ধ্যা নদীর পারে গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়ে, বালু দিয়ে নদী ভরাট করা হচ্ছে। ওখানে উঠেছে দিপু মাঝি ও জহিরের ভবন।
রিপনের জমি। সেই জমির পাশে রিপনের ছেলে আশরাফুল আলম সাকিবের জমি। সেখানে তিনি রেস্টুরেন্ট তৈরি করছেন। ওই রেস্টুরেন্টের পাশে রিপনের ভাইয়ের ছেলে জনের রেস্টুরেন্টের কাজ চলছে। মাঝখানে ফাঁকা প্রায় পাঁচ একর জমি। এগুলো প্লট আকারে ভাগ করা হয়েছে বিক্রির উদ্দেশ্যে। আর ওই জমিগুলোর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন এক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি সফিকুল আলম রিপন আর তাঁর সহযোগী হিসেবে আছেন দিপু মাঝি, জহির ও মনির। সেই প্লটগুলো পরে রয়েছে তিনটি রেস্টুরেন্ট। এগুলো হলো—রিয়ান ক্যাফেটেরিয়া, কুঁড়েঘর চায়নিজ রেস্টুরেন্ট ও বিএফসি। এগুলো সন্ধ্যা নদীর মধ্যেই।
বানারীপাড়া সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে পাওয়া উপজেলা ম্যাপ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সন্ধ্যা নদীর বানারীপাড়া মৌজায় ৪২ নম্বর জেএল-এ ৪১৩, ৪১৪, ৪১৫, ৪২৪, ৪২৫, ৪২৬, ৪২৭, ৪২৮, ৪৩১, ৪৩২, ৪৩৩, ৪৩৪, ৪৩৫, ৪৩৬, ৪৩৭, ৪৩৮, ৪৩৯, ৪৪০, ৪৪১ ৪৪২, ৪৪৩ ও ৪৪৪ দাগ সন্ধ্যা নদীর পার এবং নদীর ভেতরে। বানারীপাড়া সদর ভূমি অফিসের দেওয়া তথ্য অনুসারে, এই দাগগুলোতে প্রায় ১৫ একরের মতো জমি রয়েছে। এসএ জরিপ অনুযায়ী জমিগুলোর বেশির ভাগ হিন্দু সম্প্রদায়ের নামে। তবে বিভিন্ন সময়ে নদীর ভাঙনে সেগুলো বিলীন হয়ে যায়। সেই জমিগুলোর প্রকৃত মালিকরা স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে ভারতে চলে যাওয়ায় খাজনা পরিশোধ করেননি অনেকেই। ওই জমিগুলো স্থানীয় একটি চক্রের কারণে সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এমন দুটি নামজারির কাগজ সংগ্রহে রয়েছে কালের কণ্ঠের এই প্রতিবেদকের। বানারীপাড়া মৌজার সৃজিত খতিয়ান ২৫-১৮১৯-এর ৪৪৪ নম্বর দাগের ১৪ শতাংশের মালিক যথাক্রমে অরুণ চন্দ্র দে, শ্যামল দে, তরুণ দে ও খোকন দে। তাঁরা সবাই বানারীপাড়ার গান্ধী লাল দের সন্তান। তবে তাঁদের খতিয়ানটি এসএ ৫১৪ নম্বর খতিয়ান থেকে আগত। ওই খতিয়ানের মালিক শচীন্দ্রনাথ ও জিতেন্দ্রনাথ। তাঁদের সঙ্গে গান্ধী লাল দের কোনো সম্পর্ক নেই। এর পরও ওয়ারিশ সূত্রে তিনি (গান্ধী লাল দে) জমিটির মালিক হয়েছেন আর তাঁর সূত্রে তাঁর ছেলেরাও।
অরুণ চন্দ্র দে, শ্যামল দে, তরুণ দে ও খোকন দে নামজারির জন্য যে আবেদন করেছেন সেখানে মোবাইল নাম্বার দেওয়া রয়েছে দীপু মাঝির। কেবল এই একটি নামজারি নয়, এ রকম বেশ কয়েকটি নামজারি করিয়েছে এই চক্র। এরপর ওই জমিগুলো তাঁরা নিজেরা কিনেছেন। সেগুলো দখলে নেওয়ার পর অন্যান্য ব্যক্তির কাছে চড়া দামে বিক্রিও করেছেন।
দিপু মাঝি ও জহিরের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গত ১৭ জুন জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন এক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ইদ্রিস মল্লিক, যেখানে তিনি প্রধান অভিযুক্ত করেছেন তৎকালীন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমানকে। ইদ্রিসের দাবি, ওবায়দুরের যোগসাজশে সরকারি এসব সম্পত্তি দখল করা হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত বানারীপাড়া সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নামজারির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ পেয়েছি। সে অনুযায়ী প্রতিবেদন দিয়েছি। আর নামজারির আদেশ দেন সহকারী কমিশনার ভূমি।’
তবে ওই জমি নদী হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে প্রতিবেদন দিয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরেজমিনে ওই জায়গায় যাইনি।’
সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জলিল খান বলেন, ‘আমার কাছে একজন আইনজীবীর এফিডেভিট কপি নিয়ে এসেছিল। সেই সূত্রেই ওয়ারিশ সনদ দিয়েছি। তবে এরা আসলেই প্রকৃত ওয়ারিশ কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত না।’
অভিযুক্ত সফিকুল আলম রিপন, দিপু মাঝি, জহির ও মনির কালের কণ্ঠকে বলেন—আমরা জমি কিনেছি। নতুন সৃজিত খতিয়ান অনুযায়ী দলিল করেছি। ক্রয়কৃত জমিতে ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এতে দোষের কিছু নেই।
বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদুর রহমানের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর অফিসে সশরীরে দেখা করতে গেলেও তিনি দেখা করেননি। তবে বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নদীর এবং নদীতীরবর্তী জমি বিক্রি করার এখতিয়ার কারো নেই। বিষয়টি তদন্ত করব। সন্ধ্যা নদীর পারে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠলে অবশ্যই অভিযান চালিয়ে তা ভেঙে দেওয়া হবে।’