এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বোর্ড অনুমোদিত পাঠ্যবই ও সিলেবাসের বাইরে থেকে করা হয়নি বলে দাবি করেছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। তারপরও অনেক শিক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন অনেক কঠিন মনে হয়েছে। কয়েক জন শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে বলেন, প্রশ্ন এত কঠিন হয়েছে যে, সব কিছু মাথার ওপর দিয়ে গেছে। আবার দেশের কয়েকটি স্থানে প্রশ্ন কঠিন মনে হওয়ায় হামলা ও ভাঙচুর করেন একদল পরীক্ষার্থী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দিনে দিনে গাইড বা সহায়ক বইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের নির্ভরতা বাড়ছে। তারা শর্টকার্টে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে গিয়ে হাতে তুলে নিচ্ছে সহায়ক বই, যা তাদের মৌলিক চিন্তা ও সৃজনশীলতা বিকাশ ব্যাহত করছে। অবশ্য শিক্ষার্থীদের গাইড বই কিনতে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করেন এক শ্রেণির শিক্ষক। কারণ গাইড বইয়ের বিক্রি বাড়াতে রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিশন ও ঘুষ প্রদান বাবদ প্রতি বছর গাইড বই ব্যবসায়ীরা বরাদ্দ রেখেছে প্রায় হাজার কোটি টাকা।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে যারা বোর্ড বই না পড়ে শুধু গাইড বই বা নোট মুখস্থ করে পড়ালেখা করেছিল, তাদের কাছে প্রশ্ন অনেক কঠিন বা অচেনা মনে হয়েছে। আর যারা ভালোভাবে বোর্ড বই আত্মস্থ করেছিল, তাদের কাছে পরীক্ষার প্রশ্ন সহজ হয়েছে। শিক্ষা প্রশাসন থেকে এবার আগেই প্রশ্ন প্রণেতা এবং মডারেটরদের জন্য কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, হুবহু গাইড বই থেকে প্রশ্নপত্র করা হলে, সংশ্লিষ্টদের আইন অনুযায়ী শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে।
এমন সতর্ক বার্তার পরও মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের চলমান আলিম (এইচএসসি সমমান) পরীক্ষার ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন হুবহু লেকচার নামক গাইড বই থেকে তুলে দেওয়া হয়। এ নিয়ে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। বিষয়টি নজরে আসে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের। তিনি তাত্ক্ষণিক এই প্রশ্ন প্রণেতা ও মডারেটরদের খুঁজে তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে পাবলিক পরীক্ষা আইনে শাস্তির নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর নির্দেশের পর ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন বা সহজ হওয়ার বিষয়টি মূলত নির্ভর করে শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি এবং পাঠ্যবইয়ের মৌলিক ধারণার ওপর। মূল বইয়ের খুঁটিনাটি না পড়ে শুধু গাইড বা
টেস্ট পেপারের ওপর নির্ভর করলে প্রশ্ন কঠিন মনে হওয়া স্বাভাবিক। গাইড বইয়ে সবকিছু সংক্ষিপ্ত বা তৈরি করা উত্তর আকারে থাকে। তাই শিক্ষার্থীরা মূল বিষয়ের গভীরে গিয়ে শেখার সুযোগ পায় না। এদিকে বিগত কয়েক বছরের প্রশ্ন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বোর্ড পরীক্ষাগুলোতে সরাসরি বই থেকে না দিয়ে একটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে। ফলে নিয়মিত পড়াশোনা করা ও বেসিক পরিষ্কার থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষা তুলনামূলক সহজ হলেও, যারা শুধু সাজেশন বা বাছাই করা টপিক পড়েছে তাদের কাছে প্রশ্ন অনেক কঠিন বলে মনে হয়। প্রসঙ্গত, উচ্চ মাধ্যমিকের সব মূল বইকে বোর্ড বই বলা হয় না। উচ্চ মাধ্যমিকে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট তিন থেকে চারটি আবশ্যিক বই সরাসরি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রকাশিত হয়, যেগুলোকে মূলত বোর্ড বই বলা হয়ে থাকে। বাকি বিজ্ঞান, মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষা শাখার গ্রুপভিত্তিক বইগুলো এনসিটিবি অনুমোদিত বিভিন্ন বেসরকারি প্রকাশনী ও লেখকের কাছ থেকে কিনতে হয়।
সব শ্রেণির, সব বিষয়ের সৃজনশীল বিষয়ের গাইড বই সয়লাব :সব শ্রেণির, সব বিষয়ের সৃজনশীল বিষয়ের গাইড বই পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। অভিভাবকরা বুঝে কিংবা না বুঝেই এসব বই তুলে দিচ্ছেন তাদের ছেলেমেয়েদের হাতে। ছাত্রছাত্রীরাও ভাবনাচিন্তা ধারালো করার চেয়ে গাইড বইয়ের প্রতি বেশি মনোযোগী। অথচ সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের একমাত্র সহায়ক হওয়ার কথা পাঠ্যবই অর্থাত্ বোর্ড বই। জানা গেছে, গাইড কোম্পানিগুলোতে গোপনে মাসিক বেতনে চাকরি করছেন শিক্ষা ক্যাডারের পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা। আর গাইড বইয়ের বিক্রি বাড়াতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিশন ও ঘুষ প্রদান বাবদ প্রায় হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়।
১৫ জন মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী ও ১০ জন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ‘ক্লাসে বুকলিস্ট দিয়ে নির্দিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নোট, গাইড, গ্রামার ও ব্যাকরণ বই কিনতে বলা হয়। ফলে কিছু করার থাকে না। বাধ্য হয়েই কিনতে হয়। এটা বড় আর্থিক চাপ।’ সৃজনশীল মেধা বিকাশ নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এক আদেশে নোট বইয়ের পাশাপাশি গাইডও নিষিদ্ধ করা হয়। আইনটি লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও দেশে দীর্ঘদিন ধরে নোট-গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা চলছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব শ্রেণির ‘একের ভেতর সব’ শিরোনামে খোলস পালটে অবৈধ গাইড বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে ‘সহায়ক বই’, ‘অনুশীলনমূলক বই’।
বহু স্কুল ও মাদ্রাসায় পরীক্ষায় গাইড বইয়ের প্রশ্ন হুবহু ফটোকপি করে সেই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে :দেশের বহু স্কুল ও মাদ্রাসায় পরীক্ষায় গাইড বইয়ের প্রশ্ন হুবহু ফটোকপি করে সেই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় বহু দিন ধরেই। সম্প্রতি ময়মনসিংহ অঞ্চলের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গাইড বই, নোটবই বা অন্যান্য বাহ্যিক উত্স থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন। মাঠপর্যায়ে এরই মধ্যে এই ‘রেডিমেড’ প্রশ্নপত্র ব্যবহার বন্ধে নির্দেশনা জোরদার করা হয়েছে। এতে গাইড বা নোটবই-নির্ভর প্রশ্ন নিষিদ্ধ করে শিক্ষকদের প্রণীত প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, গাইড বইয়ের প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগটি নতুন নয়। বিভিন্ন এলাকায় বছরের পর বছর ধরে গাইডনির্ভর প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে প্রশ্ন প্রণয়নের শিক্ষাগত চর্চাও দুর্বল হয়ে পড়ে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, পরীক্ষার মৌসুম এলেই কিছু এলাকায় প্রশ্নের সেট, মডেল টেস্ট কিংবা সম্ভাব্য প্রশ্নের প্যাকেজ নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন গাইড বই ব্যবসায়ী প্রকাশনীর প্রতিনিধিরা প্রস্তুত প্রশ্নসেট, মডেল প্রশ্ন বা সাজেশন সরবরাহের প্রস্তাব দেন।
বিভিন্ন বিদ্যালয়ের উপযোগী করে গাইড ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন-সেট বিক্রি :রাজধানীর পুরান ঢাকার টিকাটুলি এলাকা ঘিরে শিক্ষাসামগ্রী, নোট ও সহায়ক বইয়ের একটি বড় পাইকারি বাজার গড়ে উঠেছে। পরীক্ষার সময় কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বিদ্যালয়ের উপযোগী করে প্রশ্ন-সেট বিক্রি করে এই এলাকায়। আসন্ন অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক, প্রাক-নির্বাচনি ও নির্বাচনি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আছে তাদের কাছে। শিক্ষকরা বলেন, প্রশ্নপত্র শিক্ষক নিজে তৈরি করলে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি, পাঠ্যক্রমের অগ্রগতি এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব হয়। মাঠপর্যায়ের পাঁচ জন শিক্ষক বলেন, বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্সল এলাকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ে পাঠদান করতে হয়। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজ, রেজিস্টার সংরক্ষণ, অনলাইন তথ্য হালনাগাদসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে সরকার নানা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বই বিতরণ। যে বইগুলো আমাদের কাছে বোর্ড বই নামে পরিচিত। এর বাইরে আছে গাইড বা সহায়ক বই। বোর্ড বইয়ের বাইরে বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই বইকে ‘সহায়ক’ বলা হলেও কার্যত তা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর।