সকালের পরিচ্ছন্ন নগরী সন্ধ্যায় যেন বর্জ্যের ভাগাড়। একদিকে সুউচ্চ অট্টালিকা, মেট্রোরেল, উড়াল সড়ক আর এক্সপ্রেসওয়ের আধুনিকতা, অন্যদিকে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক, পঁচা উচ্ছিষ্ট আর ভাগাড়ের তীব্র দুর্গন্ধ। দেশের রাজধানী যেন এক জীবন্ত ডাস্টবিন। দূষিত বাতাস, পরিবেশ আর বর্জ্যের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত এখানকার অধিবাসীরা। প্রায় ২ কোটি মানুষের এই মেগাসিটিতে ধুলাবালি আর দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। দুই সিটি করপোরেশন প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে একবার রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো শহর রূপ নিচ্ছে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে।
এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেখানে এত দিন বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ ছিল, সেখানে এবার বর্জ্য না পুড়িয়েই আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিদ্যুত্ উত্পাদনসহ বহুমুখী বাণিজ্যিক পণ্য উত্পাদন করার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। যা বাস্তবায়ন করবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে যে বর্জ্য এতকাল মহানগরের অভিশাপ ও গলার কাঁটা ছিল, তা রূপান্তরিত হবে আলো আর শক্তির এক নতুন উত্স হিসেবে।
জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে দুই সিটি করপোরেশন মিলে রাজধানীতে প্রায় শতাধিক এসটিএস নির্মাণ করে, যার ফলে রাস্তাঘাট থেকে উন্মুক্ত ডাস্টবিন বা বড় কনটেইনার অনেকাংশেই কমে আসে। তবে অপরিকল্পিত অবস্থান, জায়গার অভাব ও আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতির কারণে এগুলো এখন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের জন্য তীব্র ভোগান্তি সৃষ্টি করেছে। অব্যবস্থাপনার কারণে এসটিএসের ময়লা ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তা-ফুটপাতে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের পুরো এলাকায়। এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে বিদ্যুত্ ও পরিবেশবান্ধব পণ্যে রূপান্তরের লক্ষ্যে আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে দুটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প দুটির মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক হাজার টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হবে।
এছাড়া, মিথেন গ্যাস, সার, পশুখাদ্য ও পরিবেশবান্ধব ইকো-ব্রিকস উত্পাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। গত ১২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রকল্প দুটির অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে জানান, প্রকল্প দুটি চালু হওয়ার পর আগামী ২৫ বছর সেখানে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা সম্ভব হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তবে প্রকল্প দুটির মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশন ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রকল্প হাতে নিয়েছে, অর্থাত্ বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন। অন্যদিকে, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বর্জ্য না পুড়িয়ে পরিবেশবান্ধব ও বহুমুখী পণ্য উত্পাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ঢাকা উত্তরের প্রকল্পটির মূল কাজ পেয়েছে চীনের একটি পরিবেশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। আর দক্ষিণের কাজ পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতনামা কোম্পানি বিএন্ডএফ। এ অবস্থায় দুই সিটির গৃহীত প্রকল্পের ধরন, পরিবেশগত প্রভাব এবং কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চলছে নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রকল্প নিয়ে পরিবেশবাদীদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, বাংলাদেশের বর্জ্যে সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই থাকে পচনশীল ও ভেজা জৈব বর্জ্য, যার ক্যালোরিফিক ভ্যালু (তাপ উত্পাদন ক্ষমতা) খুবই কম। এ ধরনের ভেজা বর্জ্য পোড়াতে অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন হয়। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, প্লাস্টিক ও অন্যান্য রাসায়নিকযুক্ত বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে পোড়ানোর ফলে বাতাসে ‘ডাইঅক্সিন’ ও ‘ফিউরান’-এর মতো মারাত্মক ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে বর্জ্যের স্তূপের দুর্গন্ধ থেকে সাময়িক মুক্তি মিললেও তা ঢাকার বাতাসকে আরো দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক বায়ু দূষণের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঢাকা উত্তরের তুলনায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অপেক্ষাকৃত টেকসই একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ডিএসসিসি তাদের প্রতিদিনের উত্পাদিত ৩২০০ থেকে ৩৫০০ টন বর্জ্যকে পুড়িয়ে ফেলার পরিবর্তে তা থেকে মূল্যবান সম্পদ সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছে। এই মহাপরিকল্পনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো— বর্জ্যকে শতভাগ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা। কোরিয়ান কোম্পানির নকশা অনুযায়ী, ঢাকার বর্জ্য থেকে কোনো ক্ষতিকর ধোঁয়া না উড়িয়ে, আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাত ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য উত্পাদন করা হবে।
বর্তমানে সংগৃহীত ৩২০০ থেকে ৩৫০০ টন বর্জ্য থেকে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উত্পাদিত হবে। সেই গ্যাস ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দৈনিক হিসাবে বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিমাণ হবে প্রায় ২২১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা। ৪১০ টন পরিবেশবান্ধব জৈব সার, ২০ টন বিএসএফ প্রোটিন (পোলট্রি ফিড ও ফিশ ফিড), ১১.৫২ টন বিএসএফ তেল (কসমেটিক শিল্পের কাঁচামাল), ৪৭ হাজার ৭৭৫ লিটার পাইরোলাইসিস তেল (পেট্রোলিয়াম জ্বালানি), ৭.৩৫ টন পাইরোলাইসিস ব্লাক কার্বন (শিল্পজাত দ্রব্য), সলিড রিকভারড ফুয়েল (এসআরএফ) ২৫৫ টন এবং ইকো-ব্রিকস ১২৮ টন উত্পাদন সম্ভব হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী মাসের (সেপ্টেম্বর) মধ্যেই এ বিশাল প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা সম্ভব হবে। আর উত্পাদন শুরু হবে আগামী জানুয়ারি থেকে। এই প্রকল্পের মেয়াদ হবে ১৫ বছর। চুক্তি অনুযায়ী, জমি সরবরাহ ছাড়া এই প্রকল্পে ডিএসসিসির সরাসরি বড় কোনো আর্থিক বিনিয়োগ নেই, পুরো বিনিয়োগ আসছে বিদেশি উত্স থেকে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই প্রকল্প থেকে উত্পাদিত পণ্য বিক্রির মোট লভ্যাংশের ২০ শতাংশ সরাসরি আয় করবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এছাড়া, প্রতি মাসে জায়গার ভাড়া থেকে আরো ৫০ হাজার টাকা পাবে ডিএসসিসি। লভ্যাংশের এই বিপুল আয়ের পাশাপাশি রাজধানীর রাস্তাঘাট, ডাস্টবিন ও উন্মুক্ত স্থান থেকে ময়লা-আবর্জনার চিরতরে বিলুপ্তি ঘটবে। ফলে দক্ষিণ ঢাকার পরিবেশ হবে দুর্গন্ধমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোরিয়ান একটি কোম্পানির সঙ্গে আমাদের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সাক্ষরিত হয়েছে। প্রকল্পের কাজে মোট ৪৫ একর জায়গা দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে তাদেরকে ১০ একর জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম ইত্তেফাককে বলেন, আমি দায়িত্ব্ নেওয়ার আগেই এ প্রকল্পের কাজে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানির সঙ্গে এমওইউ হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি। প্রকল্পের কাজে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও সম্পৃক্ত। ফলে চূড়ান্ত হওয়ার আগে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের বৈঠক হবে। আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে বলে জানান তিনি।