রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সংস্থাটির লক্ষ্য—সড়ক, মেট্রোরেল, রেল, মনোরেল ও নৌপথকে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় এনে রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের যাতায়াতকে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করা। এর মাধ্যমে যানজট নিরসন, যাত্রাসময় কমানো এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান (সচিব) কালবেলাকে বলেন, ‘একজন যাত্রী টাঙ্গাইল থেকে বাসে এসে গাবতলীতে নামলেন। সেখান থেকে মেট্রোরেলে উঠে সহজেই কমলাপুর পৌঁছে গেলেন। একই যাত্রায় চাইলে মেট্রোরেলের সংযোগ ব্যবহার করে বিমানবন্দর কিংবা নৌপথেও যুক্ত হয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেন। এমন একটি সমন্বিত যাতায়াত ব্যবস্থাই বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।’
তিনি বলেন, ২০১৩ সালের জাতীয় সমন্বিত বহুমাধ্যমভিত্তিক পরিবহন নীতিমালা এবং ২০১৫ সালের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) বাস, মেট্রোরেল, রেল, নৌপথ ও বিমান পরিবহনকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সেই পরিকল্পনায় রাজধানী ও আশপাশে ২১টি মাল্টিমোডাল ও ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল।
এক দশক পর সেই পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত হয়েছে দাবি করে ডিটিসিএর পরিচালক বলেন, বর্তমানে নগর রেল পরিবহন কৌশলগত পরিকল্পনা (ইউআরএসটিপি) ২০২৬-২০৪৫-এ আটটি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন, দুটি বিআরটি করিডোর, তিনটি রিং রোড, আটটি রেডিয়াল সড়ক, ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব নিয়ে সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে কমলাপুর, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এয়ারপোর্ট/কুড়িল) এবং গাবতলীকে প্রধান মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এ-সংক্রান্ত নথিপত্র, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার পরিকল্পনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজধানীতে মেট্রোরেলের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। মেট্রোরেল লাইন-৬ চালু হয়েছে, মেট্রোরেল লাইন-১ নির্মাণাধীন এবং মেট্রোরেল লাইন-৫-এর কাজ এগোচ্ছে। পাশাপাশি কমলাপুর, বিমানবন্দর ও গাবতলীকে কেন্দ্র করে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবের পরিকল্পনাও দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব প্রকল্পের মধ্যে যাত্রীকেন্দ্রিক সমন্বয় এখনো পুরোপুরি বাস্তব রূপ পায়নি।
হালনাগাদ ইউআরএসটিপি অনুযায়ী, ঢাকায় দৈনিক যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ২০১৪ সালের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে মাত্র ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। আর ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলারের ব্যবহার বেড়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা কেবল নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ইন্টারচেঞ্জ, পথচারীবান্ধব সংযোগ, একীভূত টিকিটিং, পার্ক-অ্যান্ড-রাইড, ফিডার বাস, বাস রুট রেশনালাইজেশন এবং বিভিন্ন সংস্থার কার্যকর সমন্বয়।
ডিটিসিএ বলছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী কমলাপুরকে জাতীয় রেলওয়ে ও মেট্রোরেলের প্রধান আন্তঃসংযোগ কেন্দ্র (হাব) হিসেবে গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার অবকাঠামো ও সেবার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে যাত্রীদের এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে সহজে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে, মেট্রো রেললাইন-১, মেট্রোরেল লাইন-৪, মেট্রোরেল লাইন-৬ এবং ভবিষ্যতের অন্যান্য রেলভিত্তিক সংযোগের সমন্বয় করা হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক উন্নয়ন, অফিস, হোটেল ও আধুনিক নগর সুবিধাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করেছে সরকার। তবে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি।
ডিটিসিএ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকাকে বিমানবন্দরভিত্তিক মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এখানে মেট্রোরেল লাইন-১, মেট্রোরেল লাইন-৬, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অন্যান্য গণপরিবহনের সংযোগের সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে বিমানযাত্রী ও নগর যাত্রীরা একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারেন। অন্যদিকে, গাবতলীকে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান পরিবহন প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এখানে মেট্রোরেল লাইন-২ (পরিকল্পিত), মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর), মেট্রোরেল লাইন-৫ (দক্ষিণ) এবং আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের মধ্যে সমন্বিত সংযোগ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে নির্মাণাধীন মেট্রোরেল লাইন-১-এর আওতায় বিমানবন্দর থেকে কুড়িল, নতুন বাজার, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণ হচ্ছে। একই লাইনের পূর্বাংশ কুড়িল থেকে ৩০০ ফিট সড়ক হয়ে কাঞ্চন পর্যন্ত প্রায় ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার উড়াল পথে যাবে।
একই পরিকল্পনায় প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি সম্ভাব্য মনোরেল করিডোরের প্রস্তাব রয়েছে, যার প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। ডিমান্ড অ্যানালাইসিসের ভিত্তিতে ৩২টি প্রধান বাস রুট ও ২৫টি ফিডার রুটের একটি যৌক্তিক নেটওয়ার্ক প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রকল্পের আওতায় রাজধানীতে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, এই মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ), ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ, রাজউক, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো। ফলে এটি কোনো একক সংস্থার প্রকল্প নয়; বরং বহু প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ।
আইন অনুযায়ী ডিটিসিএর দায়িত্ব পুরো পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করা। অথচ মেট্রোরেল লাইন (এমআরটি) বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), কমলাপুর নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ রেলওয়েও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং বাস ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। ফলে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এ সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট অথরিটি আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
ঢাকার সার্বিক পরিবহন পরিকল্পনার বর্তমান অবস্থা নিয়ে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে এমনভাবে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে, যাতে বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের মধ্যে সমন্বিত সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেইসঙ্গে যানজট নিরসনসহ সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে একটি স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনে ভ্রমণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।
তিনি বলেন, সরকারপ্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নও ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে। এ ছাড়া বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থার প্রতিটি উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে।
তবে মেট্রোরেল নির্মাণই সমন্বিত গণপরিবহনের শেষ কথা নয়। বাস রুট রেশনালাইজেশন, ফিডার বাস, নিরাপদ পথচারী অবকাঠামো, সমন্বিত টিকিটিং, পার্ক-অ্যান্ড-রাইড এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কার্যকর না হলে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবের পূর্ণ সুফল মিলবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক।
তিনি কালবেলাকে বলেন, এক দশক আগে যে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার কিছু অংশ এখন দৃশ্যমান। কিন্তু সেই স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো বাকি। আগামী দিনের সাফল্য নির্ভর করবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বাস, মেট্রোরেল, রেল, নৌ ও বিমান পরিবহনকে একটি কার্যকর, যাত্রীবান্ধব ও সমন্বিত মাল্টিমোডাল নেটওয়ার্কে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ কতটা সফল হয়, তার ওপর। গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত ডিটিসিএর বৈঠকও সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।