বরিশালে হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে দৈনিক দুই থেকে আড়াই মেট্রিক টন মেডিকেল বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এগুলো নির্ধারিত নিয়ম মেনেই ধ্বংস করার কথা। তবে এসব বর্জ্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাধ্যমে যাচ্ছে ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে। সেখান থেকে আলাদা হয়ে বিভিন্ন পুনর্ব্যবহার কারখানায় কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নতুন পণ্য। আর কোটি টাকার এই অবৈধ রমরমা ব্যবসায় একদিকে যেমন ভয়াবহ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
বরিশালে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালের পাশাপাশি নগরীতে রয়েছে শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠান থেকে দুই থেকে আড়াই টন চিকিৎসা বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তবে এসব বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চিকিৎসা বর্জ্য নিরাপদভাবে সংগ্রহ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াজাত ও ধ্বংসের তদারকির জন্য জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে কমিটি থাকার কথা। তবে বাস্তবে এমন কোনো কমিটি নেই। এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী বলেন, আমি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সিটি করপোরেশনে কর্মরত। আমার জানামতে এ ধরনের কমিটি নেই।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দীন জানান, পাঁচ বছর আগে একটি সমন্বয় কমিটি ছিল, যারা চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তদারকি করত। কিন্তু সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ সেই কমিটি বিলুপ্ত করে দেন।
নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং বর্জ্য সংগ্রহস্থল ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবহৃত স্যালাইনের বোতল, ক্যানুলা, সিরিঞ্জের প্লাস্টিক, গ্লাভস, আইভি সেট, অক্সিজেন মাস্ক, পরীক্ষাগারের প্লাস্টিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণ সাধারণ বর্জ্যরে সঙ্গে একত্রে ফেলা হচ্ছে। পরে এসব বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক আলাদা করে সংগ্রহ করছেন কিছু পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এরপর কেজি দরে সেগুলো বিক্রি করা হচ্ছে ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে। দিনে প্রায় অর্ধলাখের বেশি টাকায় এসব বর্জ্য বিক্রি হচ্ছে। যা মাসে ২ কোটি টাকা ছাড়ায়।
বর্তমানে সিটি করপোরেশনই চিকিৎসা বর্জ্য অপসারণের কাজ করছে। এ বিষয়ে পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী ও সহকারী পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মাহাবুব আলম বলেন, চিকিৎসা বর্জ্যরে প্লাস্টিক আলাদা করে সংগ্রহ না করলে টোকাইরা সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বিক্রি করেন। সে কারণে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্লাস্টিক সংগ্রহ করতে এবং পরিবেশসম্মতভাবে সংগ্রহ, পুনরুদ্ধার, ধোয়া ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিক্রি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটি করপোরেশনের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী জানান, বর্জ্য সংগ্রহের পর গাড়িতেই প্লাস্টিক আলাদা করে বস্তায় রাখা হয়। পরে ৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। বিক্রির পুরো টাকা স্যারের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে পরিচ্ছন্নকর্মীরা সামান্য কিছু পান।
জানা গেছে, চিকিৎসা বর্জ্যরে সবচেয়ে মূল্যবান অংশই হলো প্লাস্টিক। আর্থিক লাভের আশায় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বর্জ্য সংগ্রহকারী ও ভাঙারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে একটি অনানুষ্ঠানিক সরবরাহ চক্র গড়ে উঠেছে। এসব প্লাস্টিক গলিয়ে পরে তৈরি হচ্ছে বালতি, মগ, ঝুড়ি, খেলনা ও অন্যান্য নিম্নমানের পণ্য। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা উপকরণ যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত বা ধ্বংস না করলে হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, এইচআইভি, টিটেনাসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা এবং মেডিকেল ওয়েস্ট বিধিমালা অনুযায়ী চিকিৎসা বর্জ্য উৎপত্তিস্থলেই পৃথক এবং অনুমোদিত পদ্ধতিতে জীবাণুমুক্ত বা ধ্বংস করার কথা। মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে নয়, বরং সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রম ছাড়া চিকিৎসা বর্জ্যরে অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার বলেন, আমি বরিশালে নতুন তাই জানা নেই। তবে এখন যেহেতু জানলাম দ্রুত এটির বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।