হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রথম ধাপে বর্তমানে কর্মরত প্রায় ১ হাজার ৪৫০ সদস্যের অর্ধেককে প্রত্যাহার করা হবে। পরে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে অবশিষ্ট সদস্যদের মধ্য থেকেও আরও এক-তৃতীয়াংশ সরিয়ে নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত পুনর্গঠিত জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটির (এনসিএএসসি) প্রথম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
তিন বছর পর এ সভা অনুষ্ঠিত হলো। বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় বেবিচকের নিজস্ব এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক), এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং অন্যান্য নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়িয়ে ধীরে ধীরে অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা কমানো হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নেতৃত্ব মূলত বেসামরিক কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকা উচিত।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, সামরিক বাহিনী সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিচালনার দায়িত্ব বেসামরিক নিরাপত্তা সংস্থা ও বিশেষায়িত এভিয়েশন সিকিউরিটি ইউনিটের হাতেই থাকা উচিত। এতে জবাবদিহি ও কমান্ড স্ট্রাকচার স্পষ্ট থাকে। তিনি বলেন, একাধিক সংস্থা যদি সমান্তরালভাবে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় ইউনিফায়েড কমান্ড ও স্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম যুগান্তরকে বলেন, আমরা চাই সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকুক। কোনো একটি বাহিনীর উপস্থিতি অতিরিক্ত বেশি এবং অন্যটির কম-এমন ভারসাম্যহীনতা দূর করতেই এ সিদ্ধান্ত। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে খুব শিগগিরই আরও বৈঠক হবে।
সূত্রমতে, দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালনকারী বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা দূর করতেই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই পুনর্বিন্যাসের অন্যতম কারণ। বিমানবাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার প্রক্রিয়া দুই ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথম ধাপে মোট জনবলের ৫০ শতাংশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হবে। এরপর তিন মাস পর অবশিষ্ট সদস্যদের মধ্য থেকে আরও অর্ধেককে সরিয়ে নেওয়া হবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়া শেষে বর্তমানে মোতায়েন বিমানবাহিনীর সদস্যসংখ্যা এক-চতুর্থাংশে নেমে আসবে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো এবং এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক)-এর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত ও টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই এই রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আনসার সদস্যরা কর্মবিরতিতে গেলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় বিমানবাহিনী। তবে এই দায়িত্ব হস্তান্তরের পর থেকেই শুরু হয় অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্বের টানাপোড়েন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং আইনগত ক্ষমতা কার হাতে থাকবে-এ নিয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও বিমানবাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। ওই সময় এপিবিএনের আইন প্রয়োগ ও দাপ্তরিক কার্যক্রম কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে।
বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় প্রবেশ, অভিযান পরিচালনা, এমনকি প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, দাপ্তরিক কাজে বাধা দেওয়া এবং অফিস দখলের অভিযোগ এনে এপিবিএনের পক্ষ থেকে বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যন্ত করা হয়।
বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এই বিরোধ আদালত পর্যন্তও গড়ায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসাবে এপিবিএনের দায়িত্ব পুনর্বহাল এবং বিমানবাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহারের দাবিতে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি সরকারকে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ সিদ্দিক উল্লাহ মিয়া রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠানো ওই নোটিশে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিমানবাহিনী প্রধানসহ আটজনকে বিবাদী করেন।
তবে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সরকার এখন বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন ভারসাম্য আনার পথে হাঁটছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিমানবন্দরের দৈনন্দিন নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের নেতৃত্ব থাকবে বেসামরিক সংস্থাগুলোর হাতে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট বা জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, দীর্ঘ প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষা ছাড়াই বিমানবাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দ্রুত মোতায়েন নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নেতৃত্ব বেসামরিক সংস্থাগুলোই দেবে। তবে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে যাতে তাৎক্ষণিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা নেওয়া যায়, সেজন্যই এই বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কমান্ড ও কন্ট্রোল নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেটিও দূর করার চেষ্টা করছে সরকার।