বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক আমদানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বড় ধরনের সংকোচন দেখা গেছে। তবে সেই সংকুচিত বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি হয়েছে তিন হাজার ৫০৯ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৮.০৪ শতাংশ কম।
এ সময় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি হয়েছে ৪০১ কোটি ডলারের। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ৫.৭৫ শতাংশ। তবে এই পতন মার্কিন বাজারের সামগ্রিক সংকোচনের তুলনায় কম হওয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভোক্তা ব্যয় হ্রাস এবং মার্কিন খুচরা বিক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতি এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তার পরও বাংলাদেশের পতন তুলনামূলক সীমিত থাকায় দেশটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক ফুটে উঠেছে।’
জুনে ফিরেছে প্রবৃদ্ধি : প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্র নেতিবাচক হলেও জুন মাসে ইতিবাচক সংকেত দেখা গেছে। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, জুনে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি হয়েছে ৭৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের একই মাসের তুলনায় ৫.৭৪ শতাংশ বেশি। রপ্তানিকারকদের মতে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে নতুন অর্ডার বাড়লে এই প্রবৃদ্ধির ধারা আরো শক্তিশালী হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা চীনের : মার্কিন বাজারে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে চীনের রপ্তানিতে। জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩৭.৬৯ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে কমেছে ২৬.৩০ শতাংশ। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের একক আধিপত্য থাকলেও এখন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা ঝুঁকি কমাতে সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যময় করছে। এর ফলে চীনের বাজার অংশ ক্রমে কমছে।
ভারতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। দেশটির রপ্তানি কমেছে ২৫.২৭ শতাংশ। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান প্রতিযোগীদের মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
সুযোগ নিচ্ছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া : মার্কিন বাজার সংকুচিত হলেও কয়েকটি দেশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে কম্বোডিয়া। দেশটির রপ্তানি বেড়েছে ১২.৩২ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ৩.৪০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের বেড়েছে ১.০৮ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবেও একই চিত্র দেখা যায়। কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধি ১৪.৫৯ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ১০.৮৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ৩.৩০ শতাংশ।
মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র : ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, অর্ডার ধরে রাখতে বেশির ভাগ দেশই ইউনিট মূল্য কমিয়েছে। বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের ইউনিট মূল্য কমেছে ২.১৫ শতাংশ। কম্বোডিয়ার কমেছে ১.৯৮ শতাংশ। পাকিস্তানের ৫.৬৩ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৬.৭৫ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে চীনের ইউনিট মূল্য, প্রায় ১৫.৪৬ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চীনের হারানো বাজারের একটি অংশ বাংলাদেশ পাচ্ছে। তবে সুযোগের পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাদের মতে, উচ্চমূল্যের এমএমএফ পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, ডিজাইন সক্ষমতা এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, বন্দর কার্যক্রম এবং লজিস্টিক সেবা উন্নত করতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বাংলাদেশ এখনো বড় ধস এড়াতে সক্ষম হয়েছে। তবে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের বাজার দখল করতে হলে এখনই উৎপাদন বৈচিত্র্য ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।