Image description

শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে না জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশের প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫৯৬টি লটে ৩০ কোটি ৬১ লাখেরও বেশি ছাপা, বাঁধাই ও সরবরাহের দরপত্র আহ্বান ও উন্মুক্ত হয়েছে। জানা গেছে, দেশে সহস্রাধিক ছাপাখানা থাকলেও এসব দরপত্রের মধ্যে প্রায় ৬০টিতে মাত্র একটি ছাপাখানা অংশ নিয়েছে। বাকিগুলোতে ৩ থেকে ৫টি ছাপাখানা অংশ নিয়েছে। প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রতি ফর্মায় তারা ১০ পয়সা থেকে ১৭ পয়সা বেশি রেট দিয়েছে। বিনা মূল্যের পাঠ্যবইয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি ফর্মা থাকে। সেই হিসাবে প্রতি ফর্মায় গড়ে ১০ পয়সা দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের অপচয় হবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা!

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বই ছাপায় এমন ঘটনা ঘটেছিল। তারা প্রাক্কলিত দর অপেক্ষা উচ্চ দরে দরপত্র দাখিল করে। কিন্তু তাদের রেসপনসিভ ঘোষণা করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যা সম্প্রতি শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় ধরা পড়ে। জানা গেছে, বই ছাপার অধিকাংশ টেন্ডার বিলম্বে আহ্বান করা হয়। যাতে ত্রুটি ধরা পড়লেও বিলম্বের ভয়ে রিটেন্ডার দেওয়ার কোনো সুযোগই না থাকে। শুধু তাই নয়, এবার এনসিটিবির এক শ্রেণির কর্মকর্তা ও ছাপাখানার মালিকরা মিলে সরকারের আরো ৩০০ কোটি টাকা অপচয় ঘটাতে যাচ্ছেন।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের ই-টেন্ডারে প্রথমে প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করা হয় প্রতি ফর্মা ৩ টাকা ১০ পয়সা। কিন্তু টেন্ডার লাইভে থাকাবস্থায় হঠাত্ বেআইনিভাবে ৩০ পয়সা বাড়িয়ে প্রতি ফর্মার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ টাকা ৪০ পয়সা। সে হিসাবে প্রতি ফর্মায় ৩০ পয়সা দাম বাড়ানোয় সরকারের অপচয় হবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি বারের মতো এবারও ৯০ ভাগ কাজ পাচ্ছে ৮-১০টি ছাপাখানা। এর মধ্যে একটি পরিবারের চার ছাপাখানা পাচ্ছে ২৫ ভাগ কাজ। মুদ্রণ শিল্প সমিতিও তাদের নিয়ন্ত্রণে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে দুর্নীতিবাজ চক্রের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। প্রতি বছরই নিম্নমানের কাগজে ছাপা হচ্ছে পাঠ্যবই। চক্রটি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাঁত করে কৌশলে ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়ে নিচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার মুদ্রণকাজের সিংহভাগ। এতে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন ক্ষুদ্র-মাঝারি মুদ্রণশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা। হতাশায় অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

জানা গেছে, সিন্ডিকেট সদস্যরা ২০২৫ ও ২০২৬ সালের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণে কিছুটা চাপের মুখে ছিল। এনসিটিবির তদন্তেও তাদের অনিয়ম ধরা পড়ে। এনসিটিবির মানদণ্ড অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির বইয়ে ৮০ জিএসএম ও ৮৫ ব্রাইটনেস নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে মাধ্যমিকের বইয়ে ৭০ জিএসএম ও ৮৫ ব্রাইটনেস থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল। ইন্সপেকশন কোম্পানির তদন্তে বের হয়ে আসে, সিন্ডিকেটের মূলহোতার প্রেসের কাগজে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভার্জিন পাল্প এবং ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ রিসাইকলড কাগজ ছিল। প্রেস দুটি ইবতেদায়ির জন্য যেসব বই সরবরাহ করে, সেগুলো ৮০ জিএসএমের বদলে পাওয়া যায় ৬৫ থেকে ৭০ জিএসএম। ব্রাইটনেসও ৮০-এর বেশি ওঠেনি। অন্যদিকে মাধ্যমিকের জন্য যেসব বই প্রস্তুত করা হয়, সেগুলোতে ৭০ জিএসএমের পরিবর্তে পাওয়া যায় ৬০ থেকে ৬৩ জিএসএম। পরে এনসিটিবির তদন্ত টিম এসব বই কেটে নষ্ট করে দেয়। একই সঙ্গে নতুন করে বই ছাপিয়ে দিতে নির্দেশ দেয় এনসিটিবি।

প্রতি বছর পাঠ্য বইয়ের রং, আকার, কাগজের মান ও কালি ঠিকঠাক আছে কি না, তা যাচাইয়ে প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) নিয়োগ দেয় এনসিটিবি। যা ইন্সপেকশন এজেন্সি নামে পরিচিত। অনুসন্ধানের জানা যায়, প্রেস মালিক ও ইন্সপেকশন এজেন্সি মিলিতভাবে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারে কারসাজি করে থাকে। ভার্জিন পাল্পে প্রস্তুত ‘ন্যাচারাল শেডে’র কাগজের পরিবর্তে নিম্নমানের রিসাইকেল কাগজের বইয়ের কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি শক্তির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এনসিটিবি যদি মার্চ মাস থেকেই টেন্ডার ও বই উত্পাদনের কার্যক্রম শুরু করে, তাহলে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই কাগজ সংগ্রহ, ছাপানো, বাঁধাই এবং উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে নভেম্বরের মধ্যেই অধিকাংশ বই সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে এবং ডিসেম্বরের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা নতুন বই হাতে পাবে।

এ ব্যাপারে জানতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও, তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, লেখালেখি করে কোনো লাভ হবে না। সিন্ডিকেটের হাত অনেক শক্তিশালী।