Image description

দেশের অভ্যন্তরে ও উজানে ভারী বৃষ্টিতে নতুন করে বন্যাঝুঁকিতে পড়েছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলা। ইতোমধ্যে নীলফামারীর ডালিয়া স্টেশনে তিস্তা ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশনে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আজ ও আগামীকালের মধ্যে সুরমা, কুশিয়ারা, তিস্তা, দুধকুমার, ভুগাই, কংস ও সোমেশ্বরী নদীর পানি নতুন করে জেলাগুলোর বিভিন্ন স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

গতকাল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এ তথ্য জানিয়েছে। বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অভ্যস্তরে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে। এ স্থানে ৪০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। উজানে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে ২৫৪ মিলিমিটার। দেশের অভ্যন্তরে রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন উজানে আরও অন্তত এক দিন ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এতে বাড়বে নদনদীর পানি।

গতকালের বিজ্ঞপ্তি অনুসারে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে জেলা দুটির নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। রংপুর বিভাগের তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বিভিন্ন স্টেশনে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া মধ্যাঞ্চলীয় ময়মনসিংহ বিভাগের সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদীর পানি শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। 

এতে জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহরী, সোলোনিয়া, ফেনী ও হালদা নদীর পানি তিন থেকে পাঁচ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার পূর্বাভাস এখনো নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ দেশের সব বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। ভারী বৃষ্টিও হতে পারে কিছু স্থানে। আগামী সপ্তাহে বৃষ্টির প্রবণতা কমতে পারে।

এদিকে, আমাদের রংপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারী প্রতিনিধির পাঠানো খবরে জানা যায়, টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি আবারও বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এটি সপ্তমবারের মতো তিস্তার পানি বিপৎসীমা ছাড়াল। এতে রংপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর তিস্তা তীরবর্তী চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও নদীভাঙন তীব্র হয়েছে এবং স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, গতকাল বুধবার সকাল ৬টা ও ৯টায় নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরে বেলা ৩টায় তা বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। একই সময়ে রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। মাত্র ৯ ঘণ্টায় সেখানে পানির উচ্চতা ১৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকে তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করেছে। নদীসংলগ্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হতে পারে এবং কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, গত ৪৮ ঘণ্টায় এ অঞ্চলে ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। ব্যারাজের ওপর চাপ কমাতে ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। তবে রাতের দিকে পানি কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা অববাহিকার কয়েকটি স্থানে নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি থাকতে পারে। ফলে তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে সাময়িক বন্যা ও প্লাবনের ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে। এ অবস্থায় নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

রংপুর: পানি বৃদ্ধির ফলে রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া উপজেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর আগে গঙ্গাচড়ার নোহালী, লক্ষ্মীটারী ও মর্ণেয়া ইউনিয়নে তীব্র নদীভাঙনে অর্ধশতাধিক বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নোহালীর কাচারীপাড়া এলাকায় এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

নীলফামারী : ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার অন্তত ১৫টি গ্রামের নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। পূর্ব ছাতনাই, পশ্চিম ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, গয়াবাড়ি, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী এবং ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আশঙ্কা, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

লালমনিরহাট:  হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকাতেও পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গবাদিপশুর খাদ্যসংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।