নাফিজ বলেছিল মা আসতেছি। কিন্তু নাফিজ এসেছে, তবে লাশ হয়ে। ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট। দিনটি নাফিজের পরিবারের জন্য শোকগাঁথা একদিন। ওইদিন সকাল সাড়ে ৬ টায় ঘুম থেকে উঠে নাফিজ। মাথায় টুপি দিয়ে পড়তে বসে। মা দেখে বলে, “আমার মোল্লা ছেলে কি নামাজ পড়ছে মাথায় টুপি দিয়ে?” নাফিজ হেসে বলে, “পড়েছি আম্মু।” সকালের রান্নায় ব্যস্ত মা। একটু পরপর পড়ার টেবিল থেকে উঠে মায়ের কাছে ছুটে যায় নাফিজ। কখনো প্রশ্ন করে, “কী করছো আম্মু? কী রান্না হবে আজ?” মা ধমক দিয়ে বলে, “যাও, পড়তে বসো।” দু’হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আম্মু, রাগ কর কেন? আম্মু,বলো না কী রান্না করছো।” মা বলে, “বেগুন ভাজা দিয়ে ডিম।” নাফিজ বলে, “ভালো রান্না করেছো।”
২০২৬ সালের ৪ঠা আগস্ট প্রতিদিনের মতোই সূর্যের আলো ফুটেছে। এদিনটি এলেই শোকে পাথর হয়ে যায় নাফিজের পরিবার। মাত্র ১৭ বছর বয়সে দেশ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করে ঢাকা নৌবাহিনী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বীর শহীদ ছাত্র মোহাম্মদ নাফিজ। ৪ঠা আগস্ট ফার্মগেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। মানবজমিনে প্রকাশিত রিকশার পাদানিতে প্রকাশিত নাফিজের ছবি পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছিল। আর প্রকাশিত এ ছবি দেখেই পরিবার জানতে পারে নাফিজ আর নেই। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ এতটাই ভারী যে এখনো নাফিজের কথা বলতে গেলেই স্তব্ধ বাবা গোলাম রহমান। নাফিজের মা নাজমা আক্তার বলেন, সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত এখন চোখের সামনে ভাসছে। ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট সকাল সাড়ে আটটার দিকে আমি নাফিজের পরনের গেঞ্জি খুলে দিতে বললে নাফিজ বলে, “তোমাকে ধুতে হবে না, আমি ধোব। তুমি অনেক কষ্ট করো আম্মু। তুমি যে এত কাজ একসঙ্গে করো, তুমি তো অসুস্থ হয়ে যাবে।” এর মধ্যে কাজ শেষ করে সকাল ১০টার দিকে নাফিজকে খেতে ডাকি। নাফিজ বলে, “আম্মু, তোমরা খাও, আমি নিজেই খাবার নিয়ে খেয়েছি।” এর মধ্যে নাফিজ আমার মোবাইল নিয়ে বসে মেসেঞ্জারে বন্ধুদের সঙ্গে মেসেজ করছে। এর মধ্যে নাফিজের বাবা বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। নাফিজ এসে বলে, “আব্বু, আমাকে ক’টা টাকা দাও।” এ সময় আমি চিৎকার করে উঠে বলি, “আজ বাপ-ছেলের কারও বাইরে যাওয়া হবে না।” তারপরও নাফিজ বাবার কাছে বায়না ধরে টাকার জন্য। বাবা ২০ টাকা দিলে বলে, “আরও কিছু দাও।” তখন আরও ১০ টাকা হাতে দিয়ে নাফিজকে বলেন, “তুমি কিন্তু একা বাইরে যাবে না। আমি ফিরে এসে তোমাকে বাইরে নিয়ে যাবো।” তার বাবা বাইরে যাওয়ার সময় নাফিজও বের হয়ে আবার বাসায় ফিরে আসে।
এর মধ্যে আমার ফোনে তিনবার ফোন দেয় নাফিজের বন্ধু। আমি নিজেই ডেকে ফোনটা দেই নাফিজকে। ফোনে কথা শেষ করে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নাফিজ আমাকে গিয়ে বলে, “আমি একটু সামনে থেকে আসিতেছি আম্মু।” আমি বলি, “বাবা, তুই তো প্রতিদিনই বাইরে যাস, আজ যাস না বাবা।” আমার চোখের সামনে দিয়েই নাফিজ বের হয়ে যায়। বেলা ১২টা বাজার পর থেকেই আমার মন অস্থির হয়ে ওঠে। এদিকে ওর বাবাও বারবার ফোন করে আমার কাছে জানতে চায় কোথায় গেল নাফিজ। বেলা ৩টার দিকে নাফিজ তার বন্ধুর মোবাইল থেকে ফোন দিয়ে আমাকে বলে, “আম্মু, আমি এক দফা এক দাবির মিছিলে আছি।” এ কথা শুনেই আমি অস্থির হয়ে বলি, “নাফিজ, বাসায় আইসা পড় বাবা, বাসায় আইসা পড়।” নাফিজ আমাকে বলে, “আসতেছি আম্মু, আসতেছি।” এটাই নাফিজের সঙ্গে আমার শেষ কথা। হ্যাঁ, নাফিজ এসেছিল, তবে লাশ হয়ে!
এরপর বেলা গড়িয়ে যায়। আমি নাফিজের বন্ধুকে ফোন দিলে সে জানায়, তাদের মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে, নাফিজের কোনো খবর জানে না। নাফিজের বন্ধুদের মায়েরা ফোন দিয়ে খোঁজ নেয় নাফিজ এসেছে নাকি? একে একে নাফিজের সব বন্ধু যার যার বাসায় ফিরে যায়। কিন্তু নাফিজ তো আর আসে না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, কারফিউ শুরু হয়ে যাবে। নাফিজের বড় ভাই তার ও নাফিজের ফেসবুক আইডিতে ‘নাফিজ বাসায় ফেরে নাই’ লিখে পোস্ট দেয়। এদিকে রাত হয়ে যাচ্ছে, কী করবো, কোথায় যাবো বুঝে উঠতে পারছি না আমরা। এমন অবস্থায় নাফিজের বাবা, আমি ও ভাই তিনজনই থানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।
সেই রাতে তেজগাঁও, কলাবাগান ও শাহবাগ তিনটি থানায় যাই। সেখানে নাফিজের কোনো খোঁজ না পেয়ে ঢাকা মেডিকেল ও পিজি হাসপাতালে খুঁজে কুর্মিটোলা হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। মহাখালী পর্যন্ত যাওয়ার পর নাফিজের ভাই মানবজমিনে রিকশার পাদানিতে নাফিজের ছবি দেখতে পায়। তখন আমরা সেই সিএনজি নিয়েই মানবজমিনের অফিসের দিকে রওনা হই। সিএনজি যখন কাওরান বাজারের মানবজমিন অফিসের নিচে, তখন নাফিজের ছোট মামা আমাদের ফোন দিয়ে বলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাওয়া গেছে। তারপর আমরা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গের সামনে যাই। তখনো জানি না নাফিজ কোথায়। আমি আমার ছোট ভাইয়ের বউকে বলি, “নাফিজ কোথায়?” সে আঙুল দিয়ে মর্গের দিকে দেখায়, তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর আর কিছু বলতে পারি না।
এরপর নাফিজকে নিয়ে তার দাদার বাড়ি দক্ষিণখানে নেয়া হলো। ৫ই আগস্ট ভোরের আলো ফুটলো। নাফিজকে গোসল করানো হলো। কী যে সুন্দর লাগছিল নাফিজকে! আমি নাফিজের দুই গালে ও কপালে চুমু খেলাম। এরপর চোখের সামনে দিয়েই আমার ছেলের লাশ নিয়ে গেলো। যখন নাফিজকে মাটি দিয়ে আসলো, তখন দেশ স্বৈরাচারমুক্ত। জুলাইয়ের শেষ দিকে নাফিজ আমাকে বলেছিল, “দেশ পরিবর্তন করতে হলে কাউকে না কাউকে জীবন দিতে হবে।” কিন্তু আমার নাফিজ যে জীবন দিয়ে দেশ পরিবর্তন করবে, এটা আমি বুঝতে পারি নাই। একজন শহীদের মা হিসেবে আমার একটাই চাওয়া আমি যেন বিচার দেখে যেতে পারি। আর কোনো সরকার যেন ক্ষমতার লোভে ছাত্র হত্যা না করে।