Image description
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত সেই ঘটনাপ্রবাহের দুই বছর আজ। সে সময়ের সহিংসতার ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাড়া করছে। কেউ হারিয়েছে সন্তান, কেউ বাবা-মা, কেউ ভাইসহ অনেক আপনজনকে। আবার কেউ চোখের সামনে গুলি, আগুন কিংবা সহিংসতার বিভীষিকা দেখে মানসিক এবং শারীরিক আঘাত নিয়ে বেঁচে আছেন। কারও শরীরে এখনো রয়ে গেছে গুলির স্প্লিন্টার, কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি, কেউ আবার পঙ্গুত্ব নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের চিকিৎসা অসম্পূর্ণ এবং জীবিকার পথও বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে হতাশা ও যন্ত্রণায়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও ভোগাচ্ছে ক্ষতস্থানের ঘা। সুচিকিৎসার আশায় কাটাচ্ছেন অপেক্ষার প্রহর।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। বাসিত খান মুসা। সবেমাত্র সাড়ে আট বছর বয়স চলে। শিশুটির নাকে সবসময় লাগানো তরল খাবারের নল। ১৯শে জুলাই ছোট্ট মুসার জীবনে নেমে আসে এক বিভীষিকা। মুসা তার বাবার কাছে আইসক্রিমের বায়না ধরে। মুসা বাবার সঙ্গে ফ্ল্যাট থেকে নিচে নেমে আসে। একটু পেছনেই ছিলেন তার দাদী মায়া ইসলাম। তাদের বাড়ি রামপুরায়। এ সময় হঠাৎ শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও গোলাগুলি। তখন মুসা বাড়ির সামনে তার বাবার সঙ্গেই দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ একটি বুলেট এসে লাগে মুসার শরীরে। মুসা মাটিতে পড়ে যায়।

তার মাথা দিয়ে রক্ত বের হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় স্বজনরা। মুসার শরীরের ডান অংশ, ডান পাসহ পুরোটাই প্যারালাইজড। সে ডান পাশ দিয়ে কোনো কিছু করতে পারে না। গুলিটা ওর লেগেছিল মাথার বাম পাশে। এক পাশ দিয়ে ঢুকে সাইড দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুসা কথা বলতে পারে না। তরল খাবার ছাড়া কিছু খেতে পারে না। মুসার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, মুসার শরীরের ডান হাত, ডান পাসহ পুরোটাই প্যারালাইজড। সে ডান অংশ দিয়ে কোনো কিছু করতে পারে না। কথা বলতে পারে না, চিবিয়ে খেতে পারে না, তরল খাবার দিতে হয়।

শুধু মুসা নয়, একই গুলিতে নিহত হয়েছে মুসার দাদী। মুসার একটু পেছনেই ছিলেন তার দাদী মায়া ইসলাম। মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হঠাৎ দেখি আমার ছেলেটা মাটিতে শুয়ে আছে। তার মাথা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। আমি তখন ওকে বুকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে দৌড় দেই। তখনো আমি জানতাম না যে, পেছনেই মা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আমি তো পাগলের মতো মুসাকে নিয়ে বাইরে দৌড় দিচ্ছি। ওই গুলিটাই যে আমার মায়ের পেটে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে, আমি জানতাম না।

আমি মুসাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাবার পর মায়ের নাম্বারে কল দিচ্ছিলাম। কিন্তু কেউ রিসিভ করছিল না। পরে বাড়ির কেয়ারটেকারের নাম্বার থেকে কল আসে যে, মায়ের গুলি লাগছে। ঘটনার একদিন পরেই মা মারা যান।
আহত মো. সোলেমান বাবলু বলেন, আমি যাত্রাবাড়ীতে আহত হয়েছি। ২০২৪ সালের ১৮ই জুলাই ঘটনাটি ছিল। আমার শরীরে মাসে তিন-চার বার প্রচুর জ্বর আসে। শরীরে থাকা বুলেটগুলোর স্থান ফুলে পেকে যায়। অনেক ব্যথা-যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে দিনের পর দিন। ডাক্তার বলছে- এটার জন্য সারাজীবন মেডিসিন খেতে হবে আর না হলে এগুলো শরীর কেটে কেটে বের করতে হবে।

আগে আমি কাজ করে সংসার চালিয়েছি। বর্তমানে আমি অক্ষম। বেশিক্ষণ বসতেও পারছি না। পাঁচ মিনিটের বেশি হাঁটতে পারি না। পায়ের পাতা থেকে একেবারে ঘাড়ে লেগেছে। তিনি বলেন, উন্নত চিকিৎসা যদি সরকার আমার জন্য ব্যবস্থা করেন তাহলে সুস্থ হতে পারি। ঘটনার দিন এলোপাতাড়ি গুলি শুরু হয়। পরবর্তীতে আমরা কয়েকজন পড়ে যাই। এ সময় আমাদের একটা ভ্যানে উঠিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়। 

এখনো আমার শরীরে ৩৫ থেকে ৪০টি স্প্লিটার আছে। দুই পায়েই বুলেট বিদ্ধ আছে। এদিকে পিঠে ও কোমরেও রয়েছে। কিছু বুলেট কেটে বের করা হয়েছে। সরকার থেকে একটা ভাতা দিচ্ছে সেটি দিয়ে চলছি।
মো. আসিফ বলেন, বাড্ডা থানা এলাকায় আমাদের বাসা। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টে এ ঘটনা ঘটে। আমি একজন গাড়িচালক। এদিন সকালের দিকে যার গাড়ি চালাই তাকে পৌঁছে দিয়ে আসি কর্মস্থলে। 

সেখান থেকে পরবর্তীতে বাসায় আসি। নির্দিষ্ট সময়ে বসকে আনতে বাড্ডা থেকে মতিঝিলের দিকে হাঁটা শুরু করি। একপর্যায়ে ২০ মিনিটের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তখনো আমি বুঝিনি এমন অবস্থা হবে। আমার সামনেই সাধারণ মানুষের উপরে গুলি চলছিল। বসকে নিয়ে কোনোমতে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে আমি বাসায় গিয়েছি। ৫ই আগস্ট চারদিকে শোনা যাচ্ছে আনন্দ মিছিল। তখন আমি বের হয়ে রাস্তায় যাই। পরে বের হয়ে দেখি ঠিকই সরকারের পতন হয়েছে। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে একটা ড্রাম নিয়ে বসে ছিলাম।

 সেখান থেকে উঠে কোনদিকে দৌড় দেয়ার সাহস পাচ্ছি না। একসময় পুলিশ একটা ফায়ার করলে তা দোকানে গিয়ে লাগে। তখন আমি অন্যদিকে সরে যাই। এসময় আমার ডান পায়ের রানে একটা বুলেট এসে লাগে। আমি ওই বুলেটের চারটা স্প্লিন্টার তুলতে পেরেছি। এখনো ২০০ এর মতো স্প্লিন্টার তুলতে পারিনি; সবগুলো আমার শরীরের মধ্যে। চিকিৎসক বলেছেন- এটা তোলা সম্ভব না, মাংসের ভেতরে গভীরে চলে গেছে। এই পা দিয়ে হাঁটতে কষ্ট হয়, পরিবারকে বুঝতে দেই না যে, আমার ব্যথা রয়েছে। আমার বাবা-মা নেই, স্ত্রী-সন্তানদের দেখার জন্য হলেও সুস্থ থাকতে হবে। ওই সময়ে যে চাকরিটা ছিল সেটি চলে যায়। এখন বেকার অবস্থায় আছি।

আহত সাকিব বলেন, আহত হয়েছিলাম ২০২৪ সালের ১৯শে জুন। ওইদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে ছিলাম। আন্দোলনরত অবস্থায় আমার হাতে, পায়ের রানে এবং বুকে চাইনিজ রাইফেলের গুলি লেগেছিল। ডান হাতটা অবশ হয়ে গেছে। বুকের ডান পাশে গুলি লেগে ভেতরে ছিল সেটি ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে বের করা হয়েছে। আমার বাসা রায়েরবাগে। এই ঘটনার আগে আমি একটা দোকানে কর্মচারী হিসেবে ছিলাম। এখন তো কিছুই করতে পারি না। ঠিকমতো ঘুম হয় না এই যন্ত্রণা নিয়ে। 

আমার বয়স মাত্র পঁচিশ বছর, এই বয়সেই জীবনটা শেষ হয়ে গেল। প্রথমদিকে যদি চিকিৎসা হয়নি, আমাদের কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেয়নি। এখন একটু ভালো চিকিৎসা করা প্রয়োজন। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে আর করতে পারিনি। আমাদের গ্রামের বাড়ি শেরপুর। দীর্ঘদিন বাবা-মা ঢাকায় থাকে। আমার আর্থিক সচ্ছলতার চেয়ে বেশি দরকার চিকিৎসা। ভালো চিকিৎসা পেলে আমি আবার কাজ করতে পারবো। একটা স্বাস্থ্য কার্ড আমাদের দেয়া হয়েছে সেটি দিয়ে কোনো কাজ হয় না। 

মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ৫ই আগস্টে নোয়াখালীতে আহত হয়েছি। ওইদিন বিকাল চারটায় আমার পায়ে বুলেট লেগেছিল। থাইল্যান্ড গিয়েও চিকিৎসা করিয়েছি। তারা আমার ডান পা বাদ দিয়ে দিয়েছে। এই পা অবশ হয়ে থাকে। পায়ের হাঁটুর উপরে গুলি ঢোকে। চিকিৎসক বলেছেন, আমি আর এই পা দিয়ে হাঁটতে পারবো না। থাইল্যান্ডে সাড়ে তিন মাস চিকিৎসার পর পাঠিয়ে দেয় দেশে। আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। রাতে ব্যথায় কাতরাতে হয়। পায়ে যেখানে রিং দিয়েছিল সেখানকার যন্ত্রণায় কিছুই করতে পারি না। আমার তিনটা সন্তান রয়েছে। আমরা যখন আহত হই তখন খুব ভালো চিকিৎসা নিতে পারিনি। প্রথমদিকে নোয়াখালীতে একটি হাসপাতালে গিয়েছিলাম সেখানে আমাদের জন্য চিকিৎসা বন্ধ ছিল। এরপর কোনোমতে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা দিয়ে আমাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠায়।