যাত্রাবাড়ী থেকে শনির আখড়া পর্যন্ত সড়ক ধরে হাঁটলে মনে হবে, এটি শুধু একটি ব্যস্ত নগরীর রাস্তা নয় এ যেন রক্তে লেখা ইতিহাসের এক দীর্ঘ প্রদর্শনী। সড়কের ডিভাইডারে সারি সারি কালো স্মৃতিফলক, কোথাও সাদা পাথরের স্মারক। প্রতিটি ফলকে একটি নাম, একটি ছবি, একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন আর একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে নির্মিত হয়েছে ‘জুলাই স্মৃতিচিহ্ন’। এখানে ৬৩ জন শহীদের পরিচয়, জীবনের সংক্ষিপ্ত গল্প তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ী মোড়ে ‘শহীদী ঐক্য চত্বর’ নামের আরেকটি স্মৃতিস্থাপনায় স্থান পেয়েছে ৫৬ জন শহীদের নাম। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রবাসী, সাংবাদিক, দিনমজুর, দোকানদার, বাবুর্চি, দর্জি, রিকশাচালক সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের নাম একই সারিতে একই ফলকে। এই ফলক যেনো দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মিলিত আত্মত্যাগের। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের বর্বর গণহত্যার সবচেয়ে বড় স্পট ছিল এই যাত্রাবাড়ী এলাকা।
এখন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করলে প্রতিটি ফলকের সামনে থমকে যেতে হয়। কোথাও লেখা, মাত্র ১৩ বছর বয়সে সংসারের অভাবে বই-খাতা ছেড়ে বাবার সঙ্গে হালিম বিক্রি শুরু করেছিল শাহাদাত হোসেন শাওন। কিন্তু জীবিকার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ। ৫ই আগস্ট আন্দোলনে গিয়ে আর ঘরে ফেরা হয়নি তার।
আরেকটি ফলকে ফুটে উঠেছে দুই সন্তানের বাবা শাহিনের গল্প। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী মানুষটি প্রতিবাদের মিছিলে গিয়ে নিহত হন। তার মরদেহের অবস্থা এতটাই বিভীষিকাময় ছিল যে, আপন ভাইয়েরাও প্রথমে তাকে চিনতে পারেননি। আজও তার স্ত্রীর প্রশ্ন “এখন কে আগলে রাখবে আমাকে?”
একটি ফলকে লেখা আছে তরুণ আলেম খুবাইবের কথা। মৃত্যুর আগে তার শেষ উচ্চারণ ছিল, “সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো ভুল না।” সেই কয়েকটি শব্দ আজও যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
কলেজ শিক্ষার্থী জিহাদ হাসান মাহিমের ফলকের সামনে দাঁড়ালে চোখ আটকে যায়। মায়ের নিষেধের জবাবে সে বলেছিল, “মা, আর একদিন মাত্র যাবো।” সেই একদিনই হয়ে ওঠে জীবনের শেষ দিন। মৃত্যুর দুইদিন আগে তার ফেসবুকে লেখা কথাগুলো আজও শিহরণ জাগায় “হয়তো দেশের কাফনের কাপড় শেষ হবে, অথবা মিষ্টির দোকান খালি হবে।”
গার্মেন্টসকর্মী হাবিব ছিলেন ছয় ভাইবোনের সংসারের শেষ ভরসা। পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর ছোট ভাই নয়ন রাস্তায় পড়ে থাকা লাশের স্তূপের মধ্য থেকে খুঁজে পান তাকে। আর মা আজও শুধু প্রশ্ন করেন, “এখন কে আমার সব করবে?”
ফার্নিচার কারিগর জোবায়েদ হোসেনের স্মরণে ফলকে লেখা তার শেষ আকুতির কথা “তোমরা আমার বাবা-মা আর ছোট ভাইকে দেখে রেখো।” কয়েকটি শব্দেই যেন ফুটে উঠেছে এক সন্তানের শেষ দায়িত্ববোধ।
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক শিহাব ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার মৃত্যুর পর মায়ের একটি বাক্যই পুরো সংসারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার গল্প বলে দেয় “আমার সংসার এখন থেমে গেছে।”
আরেকটি ফলকের সামনে দাঁড়ালে দেখা মেলে নাজমুল কাজীর অসমাপ্ত স্বপ্নের। পরিবার নিয়ে বিদেশে নতুন জীবন শুরু করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। কিন্তু দেশের সংকটের মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের পানি খাওয়াতে গিয়ে প্রাণ হারান। দুই বছরের মেয়ে নুজাইরাহ এখনো জানে না যে, বাবা তাকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখতেন, তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।
যাত্রাবাড়ী থানার বিপরীত পাশ থেকে শুরু করে কুতুবখালী, কাজলা, শনির আখড়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এসব স্মৃতিফলক শুধু কয়েকটি নামের তালিকা নয়। এগুলো এক একটি পরিবারে থেমে যাওয়া হাসি, অপূর্ণ স্বপ্ন, অশ্রুসিক্ত অপেক্ষা আর রক্তাক্ত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।