Image description

উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এতে বিদ্যুৎ বিক্রিতে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় মেটাতে পারছে না সংস্থাটি। ফলে তৈরি হচ্ছে ট্যারিফ ঘাটতি। আর সেই ঘাটতি মেটাতে সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে দেওয়া হচ্ছে ভর্তুকি। সেই ভর্তুকির অর্থ দিয়েই আবার বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করছে পিডিবি। অর্থাৎ উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা, কম দামে বিক্রি, ঘাটতি তৈরি এবং পরে সরকারি ভর্তুকিতে সেই ঘাটতি পূরণ এমন চক্রাকার আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছে বিদ্যুৎ খাত। সম্প্রতি অর্থ বিভাগে পাঠানো জ্বালানী বিভাগের এক চিঠিতে গত জুন মাসের ট্যারিফ ঘাটতি এবং আগের কয়েক মাসের বকেয়াসহ মোট ৯ হাজার ২০০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ভর্তুকি হিসেবে দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, জাতীয় স্বার্থে সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের বিল পরিশোধের জন্য এই অর্থ প্রয়োজন।

পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, শুধু জুনেই আইপিপি, রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট এবং ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিপরীতে প্রায় ৩ হাজার ৯৩৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ট্যারিফ ঘাটতি হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি করা বিদ্যুতের ঘাটতিই বড় অংশ। নথিতে ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ (যার মধ্যে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎও রয়েছে) খাতে জুনে ঘাটতি দেখানো হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

অর্থাৎ এক মাসে বিদ্যুৎ বিক্রির আয় ও বিদ্যুৎ কেনার ব্যয়ের ব্যবধানই দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের আগের বকেয়া। পিডিবি বেসরকারি খাতের আইপিপি, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ কিনে তা বড় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় সংস্থাটির আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে আংশিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পিডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের এ আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে আইপিপি, রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট ও আমদানি বিদ্যুতের বিল পরিশোধের পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে হচ্ছে। জুনের হিসাবটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ওই এক মাসেই ট্যারিফ ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় ব্যয়ের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ বিক্রির রাজস্ব দিয়ে মেটানো যাচ্ছে না।

শুধু জুনের ঘাটতি নয়, আগের বকেয়া ঘাটতিও যুক্ত হয়েছে। পিডিবির নথিতে আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড এবং কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের বকেয়া ঘাটতির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে জুনে নতুন ঘাটতির সঙ্গে পুরোনো বকেয়া যুক্ত হয়ে মোট দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২০০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। পিডিবি বলছে, সরকারের আর্থিক সহায়তা সময়মতো পাওয়া না গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ আমদানিকারকদের বিল পরিশোধে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নথিতে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত তরল জ্বালানি ও কয়লা মজুত রাখা প্রয়োজন। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সময়মতো বিল পরিশোধ করা না গেলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।