Image description

অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য এখন এক ক্রান্তিকাল পার করছে। এই অবস্থা চলছে ২০২০ সালের করোনার সময় থেকে।

এ রকম একের পর এক ধাক্কা ব্যবসা-বাণিজ্যকে সংকটের মুখে ফেলে দেয়। সেখান থেকে পুরো উত্তরণ এখনো সম্ভব হয়নি। এরপর সাড়ে পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বেসরকারি খাত। বৈশ্বিক অস্থিরতা, দেশের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জ্বালানিসংকটের কারণে ক্রমেই দুর্বল হয়েছে খাতটি।
 
দেশের শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা এখন সংকটে থাকা বেসরকারি খাতকে টেনে তুলতে ৭ শতাংশ সুদে ২০ বছর মেয়াদি অন্তত দুই লাখ কোটি টাকার পুনরর্থায়ন স্কিমের দাবি জানিয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা হলে তাঁদের প্রায় সবাই মোটাদাগে শিল্প রক্ষা, শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানো এবং ব্যবসা চাঙ্গা করতে একটি বড় তহবিলের কথা জানিয়েছেন। এটি হতে পারে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। তাঁরা মনে করেন, সরকার এই তহবিল থেকে ব্যাংকগুলোকে অর্থায়ন করবে।

ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতকে স্বল্প সুদে ঋণ দেবে। এতে রুগ্ণ শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পাবে, মানুষের কর্মসংস্থান হবে; সরকারও রাজস্ব পাবে। অর্থনীতির জীর্ণতা কেটে যাবে। তাঁরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা জানেন। তাঁরা মনে করেন, এটিই ভালো উদ্যোগ।
 
তবে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের আকার অনুযায়ী আরো বড় অঙ্কের তহবিল গড়ে তোলা হলে এর সুফল পুরো অর্থনীতিই পাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, এরই মধ্যে বন্ধ কারখানা চালু, বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিতে, বিনিয়োগ বাড়াতে এবং দেশের সার্বিক অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আরো নীতি সহায়তা এবং তহবিল সহায়তা দিতে প্রস্তুত নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ একটি। যদি ভবিষ্যতে আরো তহবিলের প্রয়োজন হয় আর সরকারের নির্দেশনা পাই তাহলে আমরা ব্যবসায়ীদের জন্য আরো তহবিল সুবিধার ব্যবস্থা করতে পারব।’

তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে অনেক ব্যবসায়ী ঋণ নিতে পারছেন না, তা আমরা জানি। তাইতো গত মাসে আমরা স্প্রেড নির্ধারণ করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছি। সেখানে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। যদি কোনো ব্যাংক ৬ শতাংশে আমানত গ্রহণ করে, তাহলে সে তার বিনিয়োগের সুদের হার ১০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অল্প সুদের আমানত গ্রহণ করলেও অধিক সুদের বিনিয়োগ করছে বেশির ভাগ ব্যাংক। কোনো কোনো ব্যাংক ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আরোপ করছে।

এ বিষয়ে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসায়ীরা চাপের  মধ্যে আছেন। তাঁরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন। কারণ নানামুখী সংকট। এর মধ্যে আছে বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানিসংকট, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার ইত্যাদি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক একটি পুনরর্থায়ন স্কিম ঘোষণা করেছে, তার পরও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কেননা এ রকম সব সময় বৃহৎ ঋণ গ্রাহকদের জন্য করা হয়। এসএমই-সিএসএমই উদ্যোক্তারা পান না। তাই আমার মতে, ফান্ডের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।

সংকটকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্বল্প সুদে পুনরর্থায়ন স্কিম গঠনের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। বাংলাদেশে করোনার (কভিড-১৯) ধাক্কা সামলাতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধার করতে সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন মেয়াদে ধাপে ধাপে সর্বমোট এক লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার (তৎকালীন জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ) প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রথমে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা দিয়ে শুরু হলেও মহামারি পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে মোট ২৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করা হয়। ওই সময়ের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই উদ্যোগ সেই সময়ের পর সবচেয়ে বড় প্রণোদনা প্যাকেজ।

ওই সময় সবচেয়ে বড় প্যাকেজ ছিল ক্ষতিগ্রস্ত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতে। ক্ষতিগ্রস্ত বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সেবা খাতের জন্য কার্যকর মূলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) হিসেবে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। ক্ষুুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সচল রাখতে ২০ হাজার কোটি টাকা কম সুদে ঋণ হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। রপ্তানিমুখী খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সচল রাখার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) বৃদ্ধি করে আকার বাড়িয়ে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখতে কৃষি ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং কৃষি পুনর্বাসনে আরো পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল তৈরি করা হয়।

ওই প্যাকেজের ফলে দেশীয় শিল্প খাত একেবারে ধসে পড়া থেকে রক্ষা পায়। এর ফলে অভ্যন্তরীণ সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল হয় এবং মহামারির পরপরই দেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। তারপর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকার বদল ও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এখনো চলমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৪.৯৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এপ্রিলে ছিল ৪.৭৫ শতাংশ। তবে মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা হলেও এই প্রবৃদ্ধির হার এখনো ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার, যা উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহ করছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নীতিগত অস্থিরতা ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমে গেছে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের চাপ নতুন ঋণ বিতরণে বাধা সৃষ্টি করছে।

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়ছে। নতুন শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ তাঁরা ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা মহামারিসহ রাজনৈতিক সহিংসতা ও অনিচ্ছাকৃত কারণে বহু ব্যবসায়ী বিগত বছরগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখেন। স্বল্প চলতি মূলধনী ঋণ পেলেই তাঁরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। তাঁদের সক্ষমতা দেখে দেখে আমরা নীতি সহায়তা দিচ্ছি। কারণ তাঁরা ঘুরে দাঁড়ালে ব্যাংকেরই লাভ। এসব গ্রাহককে এখন সুযোগ না দিলে ব্যাংকও দুর্বল হয়ে পড়বে, আবার অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কর্মসংস্থান হারাবে বহু মানুষ। তাই দেশের প্রয়োজনে হলেও রুগ্ণ শিল্প, এসএমই, সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের ঘুড়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২.২২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতির গতি আরো মন্থর হয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানিসংকট, দুর্বল চাহিদা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা শিল্প উৎপাদনে বড় চাপ তৈরি করেছে। অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্প উৎপাদন পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে শক্তিশালী করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৬ সালের মে মাসে মোট ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ৭৯৩ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকায়, যা ২০২৫ সালের মে মাসে ছিল ২৪ লাখ ৭৭০ হাজার ৭২৮ কোটি। এই হিসাবে বছরে ব্যাংকঋণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.৫১ শতাংশ।