আগে চার থেকে পাঁচ বার চেষ্টা করেও রাজধানীর চারদিকে নৌপথে ওয়াটার বাস চালানো যায়নি। প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ১২টি ওয়াটার বাস এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আর এই নৌযানগুলো চালাতে গিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) প্রায় ৫৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। ২০০০ সালে প্রথম উদ্যোগ নেওয়ার পর কয়েক দফা চেষ্টা করে সর্বশেষ ২০২২ সাল পর্যন্ত এই সেবা টিকে ছিল। সর্বশেষ গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার চারদিকে নৌপথ চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ঢাকার চারপাশের চক্রাকার নৌপথে বেসরকারি উদ্যোগে আবারও ওয়াটার বাস চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নগরবাসীর যাতায়াত সহজ করার পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক পর্যটন ও বিনোদনের বিকাশে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে সরকার এই খাতে খরচ করবে না। প্রয়োজন হলে অর্থ দেবে সরকার।
বিআইডব্লিউটিসির নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিন দফায় উত্পাদিত ১২টি ওয়াটার বাসের উত্পাদনে খরচ হয়েছে মোট ৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। সর্বশেষ কয়েক দিন আগে সদরঘাট-বাদামতলী গিয়ে দেখা গেছে, ঘাটে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে চারটি ওয়াটার বাস। অন্য নৌযানগুলোর অবস্থা আরো জরাজীর্ণ। ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথ প্রকল্পটি মূলত বিগত ২৬ বছর ধরে (২০০০ সাল থেকে) বিভিন্ন ধাপে ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে চলেছে। তবে নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে এটি কখনোই পুরো সময় সচল ছিল না।
২০০০ সালে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে যুক্ত করে ১১০ কিলোমিটারের এই বৃত্তাকার নৌপথ চালুর প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর ২০০৪ সালে প্রথম বার ওয়াটার বাস নামানো হলেও তা কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালে আবারও বড় উদ্যোগে ওয়াটার বাস নামিয়ে রুটটি সচল করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু নাব্যসংকট ও যাত্রী না পাওয়ায় তা নিয়মিত চলতে পারেনি। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন গত টানা ১০ বছর লোকসান মাথায় নিয়ে কোনো রকমে মাঝেমধ্যে সার্ভিসটি চালু রেখেছিল, যার ফলে ৫৭ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। সর্বশেষ ২০২২ সালে টঙ্গী, আবদুল্লাহপুর ও কালীগঞ্জ রুটে পাঁচটি স্পিডবোট দিয়ে বেসরকারিভাবে এই সেবা চালুর চেষ্টা করা হলেও যাত্রী সংকটে তা মুখ থুবড়ে পড়ে।
দীর্ঘ ২৬ বছরের এই ব্যর্থতা কাটাতে সরকার এখন বেসরকারি খাতের মাধ্যমে নতুন করে এই নৌপথ পুনর্দখল, দূষণমুক্ত ও সচল করার কাজ শুরু করেছে সরকার। চক্রাকার নৌপথে বিআইডব্লিউটিসি পর্যায়ক্রমে মোট ১২টি ওয়াটার বাস (নৌযান) নামিয়েছিল। ২০১০ সালে শুরুতে দুটি ওয়াটার বাস (এমএল তুরাগ এবং এমএল বুড়িগঙ্গা) দিয়ে এই সেবা চালু করা হয়। ২০১৩ সালে দ্বিতীয় ধাপে বহরে আরো চারটি নতুন ওয়াটার বাস যুক্ত করা হয়। সর্বশেষ ২০১৪ সালে তৃতীয় ধাপে আরো ছয়টি ওয়াটার বাস নামানো হয়। ৮১ ও ৩৫ আসনবিশিষ্ট এই ওয়াটার বাসগুলো গাবতলী থেকে সদরঘাট রুটে চলাচল করত।
অব্যবস্থাপনা, পন্টুনের অভাবসহ নিজেদের সব দায় পাশ কাটিয়ে ওয়াটার বাস সার্ভিসে যাত্রীসংকটের জন্য নদীদূষণকে দায়ী করেছে বিআইডব্লিউটিসি। পানিতে দুর্গন্ধের কারণে যাত্রীরা নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও এই সেবা নিতে আসেনি বলে দাবি তাদের। তবে ঐ সময় যাত্রীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানিয়েছিল—অব্যবস্থাপনা, পন্টুনের অভাব, ঘাট ইজারাদারদের বাধা, ওয়াটার বাসগুলোর ধীরগতি-যান্ত্রিক ত্রুটি ও পরিকল্পনার অভাবের কারণেই এটা চলেনি। তবে যাত্রীসংকটের জন্য বুড়িগঙ্গার দূষণকে দায়ী করছে সংশ্লিষ্টরা। অনেকেই বলছেন, এবারও যদি দূষণ না কমিয়ে আবারও ওয়াটার বাস নামানো হয়, তাহলে ভালো ফল দেবে না। বিআইডব্লিউটিসি বলছে, আপাতত পুরোনো ওয়াটার বাসগুলোকে সংস্কার করে প্রথমদিকে চালানো হবে। এরপর যাত্রীরা আকৃষ্ট হলে ধাপে ধাপে নতুন ওয়াটার বাস নামানো হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব অবশ্য মনে করেন, শুরুর পরিকল্পনাতেই ভুল ছিল। এর সঙ্গে কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহ মিলে এই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ওয়াটার বাসের ঘাটগুলো মানসম্মত ছিল না। ঘাটের সংলগ্ন এলাকায় বাস সার্ভিস থাকা প্রয়োজন। যাতে করে যাত্রীরা সহজে ঘাটে এসে ওয়াটার বাসে চড়তে পারেন। কিন্তু তা নেই। তিনি বলেন, ‘জ্ঞানপাপীরা জেনেবুঝে এ সেবাটিকে গলা টিপে হত্যা করেছে।’
সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সড়ক ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরপর ধাপে ধাপে ঢাকার চক্রাকার নৌপথে ওয়াটার বাস চালু করা হবে। আশুলিয়া থেকে সদরঘাট হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত নদীপথের একটি অংশ যাত্রী পরিবহনের জন্য উপযোগী হলেও অন্য অংশে এখনো বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সড়কপথে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় দীর্ঘ সময়ের নদীপথে যাত্রী আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মন্ত্রী বলেন, বিআইডব্লিউটিসি অতীতে ওয়াটার বাস পরিচালনা করলেও যাত্রীস্বল্পতা, নদীদূষণ এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে গত ১০ বছরে সংস্থাটির প্রায় ৫৭ কোটি টাকা লোকসান হয়। ফলে সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। এবার কয়েক জন বেসরকারি উদ্যোক্তা ওয়াটার বাস পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছেন। তারা শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন ও বিনোদনের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে চান। দীর্ঘ রুটে যাত্রী বাড়াতে হলে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরপর ওয়াটার বাস পরিচালনার প্রয়োজন হবে। তবে এতে পরিচালন ব্যয় বাড়বে। তাই প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে টেকসই করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নদীদূষণকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নদী পরিষ্কার না থাকলে মানুষ নদীপথে যাতায়াতে আগ্রহী হবে না। এজন্য নদী পরিষ্কার, দুই তীরের পরিবেশ উন্নয়ন এবং নৌপথকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই থেকে তিন মাস পর অগ্রগতি পর্যালোচনায় আবার বৈঠক হবে।