Image description

দেশে সরকার বদল হলেও মাদক সিন্ডিকেটের চরিত্র বদল হয় না। আগে মাদক বা ইয়াবার নাম শুনলে সবার আগে ভেসে উঠত আবদুর রহমান বদির নাম। তবে বদিকে এখনো কেউ ছুঁতে না পারলেও অনেকেই দৌড়ে আছেন। বেশ কিছুদিন ধরে বদিরা কারাগারে থাকলেও মাদকের রুট বা চেইন অক্ষত রয়েছে। আগেও সীমান্ত ও বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ঢুকত মাদক, এখনো সেখান দিয়েই ঢুকছে। বিভিন্ন পর্যায়ে সিন্ডিকেট সদস্যদের ছত্রছায়ায় পৌঁছে যাচ্ছে গ্রহকের হাতে। বদিদের জায়গায় অন্য কেউ নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক নেতারা সাধারণত আড়ালেই থেকে যান। মাঝেমধ্যে সেই পুরোনো স্টাইলে নিরুপায় হয়ে দুই-চারটা ছোটখাটো রাজনৈতিক নেতাকে জেলে ঢোকানো হচ্ছে। কিছুদিন যেতে না যেতেই কারামুক্ত হয়ে আবার আগের পেশায় যুক্ত হচ্ছে। সেই পুরোনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি মাত্র। শটকাটভাবে বিপুল বিত্তের মালিক হওয়ার লোভ সংবরণ করতে না পারাই জাতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন রাজনীতি তাদের সাইনবোর্ড, আর মূল ব্যবসা মাদক।

জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধেই কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী কারও পরিচয় বা দল বিবেচনা করছি না। অপরাধে জড়িত যে কারও বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, সারা দেশেই মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলছে।

সূত্র জানায়, গত শনিবার দুপুরে ডিবি লালবাগ বিভাগের একটি টিম অভিযান চালিয়ে ৫১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির পাড়গেন্ডারিয়া ইউনিটের সভাপতি রিপন মিয়া ও তার সহযোগী ফারুক ওরফে টেপা ফারুককে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে ৩৫০০ পাতা হেরোইন উদ্ধার করা হয়। তবে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা উল্লেখ করেননি ঢাকা মাহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিরা পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী। এর আগেও তারা গ্রেফতার হয়েছে। তবে বিএনপির একটি সূত্র নিশ্চিত করে বলেছে, তারা দুজনই এলাকায় মাদকের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন। তাদের কারণে এলাকায় বিএনপির ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ডিবি লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রওনক আলম যুগান্তরকে বলেন, উদ্ধার মাদকসহ রিপন ও ফারুককে রোববার আদালতের মাধমে কারাগারে পাঠানো হয়।

ডিবি সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে মো. ফাইয়াজ ওরফে মুন্নাকে ৬ জুন রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেফতার করে। মুন্না রাজধানীর পল্লবী থানার ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক। মিরপুর সাংবাদিক কলোনির সামনে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে ৫ প্যাকেট হেরোইন এবং প্রায় এক হাজার ইয়াবাসহ আটক করা হয়। সূত্র জানায়, ২৫ জুন লালমনিরহাটের আদিতমারী থানার ভেলাবাড়ী বাজারে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মাদকবিরোধী অভিযানে ১০০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট রাখার দায়ে আদিতমারীর ভেলাবাড়ী ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি খোকন মিয়াকে আটক করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নোয়াখালীর চাটখিলের ভিমপুর গ্রামের বেদেপল্লিতে একটি অভিনব কায়দায় মাদক আস্তানা গড়ে তুলেছিল ববিতা আকতার সুমাইয়া। সাধারণ ঝুপড়ি ঘরের ভেতরে এসি (এয়ার কন্ডিশনার) ও সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে নিরাপত্তার চাদরে মাদক ব্যবসা চালাতেন তিনি। প্রভাবশালী হিসাবে পরিচিত এই সুমাইয়ার ভায়ে স্থানীয়রা মুখ খুলতে সাহস পেত না। ১৬ জুন যৌথ বাহিনী অভিযানে আস্তানাটি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয় এবং কুখ্যাত মাদক কারবারি সুমাইয়াকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগেও তিনি ছয়বার গ্রেফতার হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত নভেম্বরেও গ্রেফতার করা হয়। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের সঙ্গেই তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সারা দেশেই প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মাদক কারবারিরা অবলীলায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে বড় বড় মাদকের চালান নানা কৌশলে রাজধানীতে ঢোকে। অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যানার বা স্টিকারযুক্ত পরিবহণ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযানে নামলেও প্রভাবশালীরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে অভিযান চললেও মাদকের কারাবারে কোনো বিরতি নেই। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আগের ক্ষমতাসীন দলের ছায়ায় যারা মাদক স্পট, পরিবহণ ও খুচরা বিক্রির নিয়ন্ত্রণ করতেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তাদের একটি অংশ গা ঢাকা দিয়েছে বা ভোল পালটে ফেলেছে।

তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন বর্তমান রাজনৈতিক দলের সদস্যরা। নতুন প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে নতুন সিন্ডিকেট। তাই মাদকের স্পটগুলো বন্ধ হয়নি বরং নতুন করে হাতবদল হয়ে আগের মতোই জমজমাট রয়েছে। আর মাদক ব্যবসা মানেই প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের প্রবাহ। এই কালোটাকায় সন্ত্রাসী বাহিনী টিকিয়ে রাখা, মামলার খরচ চালানো এবং রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তারের জ্বালানি হিসাবে কাজ করছে। এ কারণে ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা এই নগদ অর্থের লোভ সংবরণ করতে পারেন না।

অনুসন্ধানী সূত্র জানায়, রাজধানীর ভাটারা থানার কুড়িল কুড়াতলী মসজিদসংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে মাদকের হাট। কুড়াতলী প্রধান সড়ক ও আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় তরুণদের আনাগোনা এখানে। জানা যায়, সেলিনা নামের এক নারী দীর্ঘদিন এ এলাকায় মাদক বেচাকেনা করে আসছেন। নিজেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ দাবি করে তিনি এলাকায় একপ্রকার ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়া মাদকের চালান তার হাত দিয়েই বাজারে বিক্রি হয়। সেলিনার পেছনে রয়েছেন কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। স্থানীয়রা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক ভীতি প্রদর্শন করেন তিনি।

দেশের সবচেয়ে বড় মাদকের প্রবেশদ্বার হিসাবে পরিচিত কক্সবাজারের টেকনাফ ও তৎসংলগ্ন সীমান্ত অঞ্চল। অতীতে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যকে ম্যানেজ করে এই চক্র বিশাল মাদকের সাম্রাজ্য পরিচালনা করত। ওই সময় কেউ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে মিথ্যা মামলা বা হয়রানির শিকার হতে হতো। এই সিন্ডিকেটের গডফাদার হিসাবে উঠে এসেছিল সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির নাম। 

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর স্থানীয় সেই পুরোনো গডফাদারদের অনেকেই এখন পলাতক কিংবা মামলা এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছেন। কিন্তু মাদকের রুট বা সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয়নি। পলাতক বা নিষ্ক্রিয় নেতাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন রাজনৈতিক পরিচয়ে নতুনভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা ব্যক্তিরা। পুরোনো নিয়ন্ত্রকরা পালিয়ে যাওয়ায় তার জায়গা দখল করেছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। ডেলিভারি বয়, স্পট পাহারা দেওয়ার লোক এবং পাইকারি বিক্রেতা-সবাই আগের মতো বহাল রয়েছেন। কেবল রাতের আঁধারে চাঁদার টাকা বা আশ্রয়দাতাদের মুখগুলো বদলেছে।