বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন মো. গোলাম নাফিজ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন কলেজে তেমন ক্লাস হতো না। ১৮ জুলাই খেলার কথা বলে প্রথমে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে মিছিলে অংশ নেন। একপর্যায়ে মহাখালী স্কেচ টাওয়ারের সামনে পুলিশের রাবার বুলেটে আহত হন। আহত অবস্থায় কিছু সময় পাশের একটি ভবনে লুকিয়ে ছিলেন তিনি। পরে আবার মিছিলে যান। রাতে বাসায় এসে মাকে বলেন, ‘আমি ভীতু নাকি, গ্যাস খাইছি, বুলেট খাইছি।’ বুলেটের কথা শুনে মা তাকে জিজ্ঞেস করেন-‘বাবা তুমি কোথায় রাবার বুলেট খাইছ?’ নাফিজ তাকে দেখায় না। তার কাছে লুকানোর জন্য বাসায় ট্রাউজার পরল। পরে মোবাইলে থাকা ছবিতে নাফিজের মা দেখতে পান, তার রানে অনেকগুলো রাবার বুলেটের ক্ষত।’ শহীদ নাফিজের মা নাজমা আক্তার নাসিমা কিশোর ছেলের দুঃসাহসী সময়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সোমবার যুগান্তরের সঙ্গে কথা হয় নাফিজের মা নাজমা আক্তার নাসিমার। তিনি জানান, আহত অবস্থায়ও ১৮ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেয় নাফিজ। ৪ আগস্ট ছিল তার জীবনের শেষ দিন।
ওইদিন সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে কাওরান বাজার এলাকার দিকে যায়। সেখান থেকে আন্দোলনকারীদের মিছিলের সঙ্গে ফার্মগেট এলাকার দিকে যায়। ফার্মগেট এলাকাতেই পুলিশের গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যায় নাফিজের দেহ। গুলির পর গুলি। রক্তাক্ত দেহ রাস্তায় ফেলে মুখে বুট দিয়ে লাথি মেরে পুলিশ তার দাঁতগুলোও ফেলে দেয়। এ অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকা নাফিজকে এক রিকশাচালক ভয়ে ভয়ে রিকশায় তুলে পাশের হাসপাতালে নিয়ে যান। ওখানে চিকিৎসা না পেয়ে তার মৃত্যু হয়। জাতিসংঘ জুলাই আন্দোলনে নিহতদের নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তার প্রচ্ছদে শহীদ নাফিজের মর্মন্তুদ ছবিটি স্থান পায়।
নাজমা আক্তার নাসিমা দামাল ছেলের দেশপ্রেম নিয়ে গর্ববোধ করে বলেন, ‘আন্দোলন চলাকালে নাফিস একদিন প্রাইভেট পড়া শেষ করে এসে বলল, আম্মু তিতুমীর কলেজ থেকে ছেলেদের ধইরা নিয়া গিয়া কমিশনারের লোকজন কুকুরের মতো পিটাইছে। আমি এগুলো সহ্য করতে পারিনি। দেশটা অমানুষে ভরে গেছে। আমাদের বড় ভাইয়েরা বৈষম্যহীন দেশ চেয়ে আন্দোলন করছে। দেশে বৈষম্য না থাকলে আমরা সবাই সমান অধিকার পাব। কোনো কোটা থাকবে না।’
ছেলের এমন কথায় নাসিমা চিন্তিত হয়ে পড়েন। এই ছেলেকে তো বেঁধেও রাখা যাবে না। দেশের জন্য তার অনেক টান। নাফিজের ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার নাফিজ পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ত। খেলাধুলা পছন্দ করত। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় কেনা ফুটবলটা এখনো ঘরে আছে। নাফিজ রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাত। আবার সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ত।’ ৪ আগস্ট সকালে আমি রান্নাঘরে কাজ করছিলাম। নাফিজ রান্নাঘরে আইস্যা আমাকে বলল-‘আম্মু এইটাও কিয়ামতের একটা লক্ষণ-দেশে পুলিশের সংখ্যা বেড়ে যাবে। দেখছ পুলিশের সংখ্যা কত বেড়ে গেছে।’ ওইদিন ঘর থেকে বের হওয়ার দশ মিনিট আগে বারবার আমার কাছে আসে। আইস্যা জিজ্ঞাস করে-‘আম্মু আজকে কী রান্না করছ’, আমি শুনে চিন্তায় পড়ে যাই। কখনোই সে এভাবে জানতে চায়নি। ছেলের স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাজমা আক্তার নাসিমা বলেন, ‘আমি তখনো জানতাম না ওই জড়াইয়া ধরা আমার নাফিজের শেষ দিন ছিল।’
শহীদ নাফিজের মা বলেন, আন্দোলনের সময় আমার ছেলেটি দেশ নিয়ে জড়িয়ে পড়ে। ছেলে কোথাও যাওয়ার আগে আমাকে সালাম দিয়ে বাসা থেকে বের হতো। কিন্তু ওইদিন বাইরে যেতে নিষেধ করায় আমার সঙ্গে দেখা না করেই চলে যায়। পরে আমি দেখি নাফিসের মোবাইল, ঘড়ি, ওয়ালেট সবকিছুই তার টেবিলে। ছেলে ফিরছে না। ওর বাবা বেশ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। তিনি নাফিসের বন্ধু মুহিতের মোবাইলে ফোন দেন। মুহিত বলে, ‘আমরা আলাদা হইয়া গেছি। আমরা এনটিভি ভবনের সামনে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ এলাকার দিকে আছি। সেখান থেকে ফার্মগেট এলাকার দিকে যাচ্ছি। নাফিজের মা বলেন, ‘আমি কল্পনাতেও আনি নাই যে, আমার নাফিস ফিরবে না। কিন্তু আমার বাবাটাকে দুনিয়া থেকেই বিদায় করে দিল ওরা।’
হাসপাতাল থেকে ছেলের মৃতদেহ আনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, নাফিজকে যখন রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন ওর মাথায় বাংলাদেশের একটা পতাকা ছিল। কিন্তু যখন আমরা লাশ আনতে যাই তখন আর ওই পতাকাটা পাইনি। ছেলের রক্তাক্ত দেহের ছবি হাতে নিয়ে তিনি বলেন, স্কাউটের বাচ্চারা আমাকে বলছে, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়ার পরও আমার নাফিস ২০ মিনিট বেঁচে ছিল। কিন্তু কেউ সরকারি দলের লোকজনের বাধার কারণে চিকিৎসা দেয়নি।
শহীদ পরিবারগুলোর কথা বলতে গিয়ে নাফিজের মা বলেন, যেভাবে শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মুগ্ধের কথা উঠে আসছে সেভাবে কিন্তু নাফিজদের মতো শহীদদের নাম আসছে না। এটা আমরা সবাই-ই মানি আবু সাঈদ, মুগ্ধদের দেখেই আমাদের সন্তানরা অনুপ্রাণিত হয়েছে। তবে নাফিসরাও বীর।
নাফিজের মা বিচার নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, আমরা জানি না আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে বিচার পেতে। জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেন তিনি। হবিগঞ্জে এক শিশুর চোখ উপড়ে ফেলার ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশীজনের মধ্যে বিভেদ থাকলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ছাত্র-জনতা যে উদ্দেশ্যে জীবন দিয়েছে সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি-আক্ষেপ করে বলেন তিনি। সবার জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে মৃত্যুর আগে এমন বাংলাদেশ দেখে যেতে চাই-এমনটিই নাফিজের মায়ের শেষ দাবি।