কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে গ্যাসসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সরবরাহ কম থাকায় রান্নার চুলায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে লোডশেডিং হচ্ছে। শিল্পকারখানাগুলোতেও উৎপাদনের গতি কমে গেছে। সিএনজি স্টেশনগুলোয় গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে।
বেড়ে গেছে পরিবহন ভাড়াও। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (কেজিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিন এ প্রসঙ্গে জানান, পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে গ্যাসের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তারা যেটুকু সরবরাহ করেন কেজিডিসিএল সে অনুযায়ী বিতরণ করে। জাতীয় গ্রিডেও এ-সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। চট্টগ্রামের জন্য যা বরাদ্দ করা হচ্ছে সেগুলো খাতওয়ারি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিতরণ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, আমদানীকৃত তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রূপান্তর করে ব্যবহার উপযোগী করতে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিট এলএনজি টার্মিনাল পরিচালিত দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এ দুই টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদার প্রায় পুরোটাই এসব টার্মিনাল থেকে আসে।
এর মধ্যে ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। ফলে জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ কমার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও এর প্রভাব পড়ে। কেজিডিসিএল সূত্র জানান, চট্টগ্রামে আবাসিক, বাণিজ্যিক, ক্যাপটিভ পাওয়ার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রতিদিন ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর থেকে গতকাল ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ কমে গেছে। যার প্রভাবে ভুগছেন গ্রাহকরা।
সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, গত শুক্র ও শনিবার যথাক্রমে চাহিদার বিপরীতে ২৩০ মিলিয়ন ও ২১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে কেজিডিসিএল। এ দুই দিনে যথাক্রমে ১২০ ও ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি ছিল। আর সর্বশেষ রবিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে সংস্থাটি। যা মোট চাহিদার ৫৫ শতাংশের মতো। ফলে চাহিদার চেয়ে ৪৫ শতাংশ ঘাটতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে সংস্থাটিকে।
গ্যাসের এ তীব্র সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ কমিয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করছে কেজিডিসিএল। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় চাহিদার বিপরীতে ৮ মিলিয়ন ঘনফুট, দুটি সার কারখানায় ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। এ ছাড়া বৃহৎ শিল্পকারখানায়ও সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পরও সংকট মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় উৎপাদন কমে গেছে।
ফলে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া সার কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও উৎপাদনের চাকা ধীরে চলছে। তবে সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক ও ছোট আকারের বাণিজ্যিক গ্রাহকরা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকবর হোসেন জুয়েল সংশ্লিষ্ট বিভাগের বরাতে বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় শিকলবাহাসহ গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে।
এ কারণে কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে।’ এদিকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় মহানগরের হালিশহর, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, চকবাজার, বহদ্দারহাটসহ বেশ কিছু এলাকার গ্রাহক চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত গ্যাসের চাপ নেই। সন্ধ্যার পরও চাহিদামতো গ্যাস মিলছে না। ফলে রান্নাবান্নাসহ অন্যান্য দৈনন্দিন কাজকর্ম থমকে যাচ্ছে। অনেক বাসিন্দাকে রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।
হালিশহরের বাসিন্দা শহীদ চৌধুরী বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ চুলা ঠিকমতো জ্বলছে না। রান্না বসালেও দীর্ঘ সময় লাগছে। স্বাদ নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া পানি ফোটানো যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কয়েক দিন হোটেল থেকে খাবার কিনে খেয়েছি।’ অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোয় এখন অটোরিকশা, বাসের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। ফলে মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন চালকরা।
এ ছাড়া গ্যাসচালিত বাসগুলোতেও ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও চালকদের বাদানুবাদ চলছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি মেরামত করতে এরই মধ্যে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও বিশেষজ্ঞ দল আনা হয়েছে। তবে মেরামতের পর পুরোপুরি সচল করতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে এর মধ্যে টার্মিনালটির দুটি বয়লারের মধ্যে অন্তত একটি চালু করার চেষ্টা চলছে। সেটি চালু হলে ঘাটতি কমে আসবে।