Image description

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন নতুন মোড় নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর বাণিজ্য সম্পর্ককে বিনিয়োগ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম উচ্চগতির রেল (বুলেট ট্রেন), চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, চীনা বিনিয়োগ এবং দেশীয় পণ্যের জন্য চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার এই চার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে।

চীন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই বাণিজ্যে বাংলাদেশের বিপুল ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবছর বাংলাদেশ চীনে প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও দেশটি থেকে আমদানি করে ২২ থেকে ২৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ থেকে ২২ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ঘাটতি কমানোর পথ শুধু চীন থেকে আমদানি কমানো নয়; বরং চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো এবং দেশটিকে বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা। এতে একদিকে চীনা মূলধন ও প্রযুক্তি আসবে, অন্যদিকে বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হবে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে চীনের বাজারে প্রায় ৯৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু এই সুবিধার তুলনায় রপ্তানি খুবই কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব, চীনা ভোক্তা বাজার সম্পর্কে সীমিত ধারণা, আন্তর্জাতিক মান ও সার্টিফিকেশন জটিলতা এবং বিপণন সক্ষমতার ঘাটতি রপ্তানি বাড়ানোর পথে বড় বাধা।

তৈরি পোশাক খাতে চীনা বাজারে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে নিট পোশাক, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য, টেক্সটাইল ও পরিবেশবান্ধব পোশাক রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব। একইভাবে চামড়ার জুতা, ব্যাগ ও অন্যান্য চামড়াজাতপণের বাজারেও বাংলাদেশ সুযোগ নিতে পারে। প্লাস্টিকের বিকল্প পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় পাটের ব্যাগ, প্যাকেজিং ও হোম টেক্সটাইলও চীনের বাজারে সম্ভাবনাময় পণ্য হতে পারে।

চীনের বিশাল খাদ্যবাজারে আম, চা, মসলা ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের জেনেরিক ওষুধও দীর্ঘমেয়াদে চীনের বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনাময় খাত। তবে এ ক্ষেত্রে চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রক ও মাননির্ধারণ প্রক্রিয়া পূরণ করতে হবে। বাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগও বাড়ছে। তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চীনা কোম্পানিগুলোর ঘোষিত ও চলমান বিনিয়োগের পরিমাণ ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। 

বিদ্যুৎ, পরিবহন, অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল ও উৎপাদন খাতে এসব বিনিয়োগের বড় অংশ রয়েছে। চীনের সহযোগিতায় নির্মিত কর্ণফুলী টানেল চট্টগ্রাম শহর ও আনোয়ারাকে সরাসরি যুক্ত করেছে। এর ফলে বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে নির্মিত রেল সংযোগ প্রকল্পেও চীনা প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। এ প্রকল্প ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি জাতীয় রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ-চীন যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্পও দেশের বিদ্যুৎ খাতের বড় প্রকল্পগুলোর একটি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি সঞ্চালন ও অবকাঠামো উন্নয়নেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার অন্যতম বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে ঢাকা-চট্টগ্রাম উচ্চগতির রেল প্রকল্প। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মধ্যে দ্রুত রেল যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৫ থেকে ২৩১ কিলোমিটার। বর্তমান রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২১ কিলোমিটার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি হতে পারে ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম যাত্রায় সময় লাগতে পারে ৫৫ থেকে ৭৫ মিনিট। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৩ থেকে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশন (সিআরডিসি) প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। তবে উচ্চ ব্যয়ের কারণে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এর সুফল শুধু দ্রুত যাত্রী পরিবহনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম ও মিরসরাইকে যুক্ত করে এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত হতে পারে। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা শিল্প বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে। বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে।

একই সঙ্গে বন্দরনির্ভর শিল্প, মিরসরাই শিল্পনগর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের সম্ভাব্য শিল্পায়নের কারণে অঞ্চলটি ভবিষ্যতের উৎপাদন ও রপ্তানি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে বে টার্মিনাল প্রকল্পও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা ও পণ্য পরিবহনের দক্ষতা বাড়বে। এতে রপ্তানি ও আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। 

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশে রেল, সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ ও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ছে। তবে ভবিষ্যতে এ সহযোগিতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ। মঈনুল ইসলামের মতে, চীনা বিনিয়োগ যদি বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল, রপ্তানিমুখী উৎপাদন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেই সহায়তা করবে না, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বাড়াবে। 

ফলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি পণ্য আমদানি নয়; বরং চীনা বিনিয়োগে বাংলাদেশে উৎপাদন, চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর। ঢাকা-চট্টগ্রাম উচ্চগতির রেল, চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন, চীনা বিনিয়োগ এবং বাজার সুবিধা সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে আমদানিনির্ভর বাণিজ্য সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিনিয়োগ ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ নিতে পারে।