নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ছোঁয়ায় বিশ্বজুড়ে সূচিত হয়েছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। এই শিল্প বিপ্লবের যুগে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট’। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিক্স, বিগ ডাটা ও ব্লকচেইনের বিস্তার নিরবচ্ছিন্ন ডেটা সংযোগ ছাড়া কল্পনাও করা যায় না। এই রূপান্তরের যুগে ইন্টারনেট এখন আর কোনো বিলাসিতা বা নিছক বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং রাষ্ট্রের সার্বিক অর্থনীতি ও অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক অবকাঠামো।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, ডিজিটাল সেবা ও অনলাইন নির্ভরতা প্রসারের সাথে সাথে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে ইন্টারনেট। বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন গিগাবিট গতির ইন্টারনেটকে ভিত্তি করে ‘ডিজিটাল ইকোনমি’ গড়ে তুলছে। বাংলাদেশের মতো অবস্থান থেকে কেবল ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে ভিয়েতনাম এখন ইমার্জিং অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর দ্রুতগতিতে ইন্টারনেট অবকাঠামো গড়ে তুলছে শ্রীলংকা ও নেপাল। অথচ এর ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। দেশে এখনো ধীরগতির ইন্টারনেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। ফিক্সড ব্রডব্যান্ড কিংবা মোবাইল ইন্টারনেট কোনটিতেই কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। কাগজে-কলমে শতভাগ ফোরজি কাভারেজ, উচ্চগতির ইন্টানেটের বুলি আওড়ালেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কেবল গ্রাহকদের অভিযোগই নয়, বরং বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ইন্টানেটে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার চিত্র।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সূচক অনুসারে, সাবমেরিন ক্যাবল ও আইটিসি ব্যান্ডউইথ সংযোগে বাংলাদেশ আগের চেয়ে এগোলেও আন্তর্জাতিক মানের গতির বিচারে এখনও বেশ পেছনে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশে ফোরজি নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটলেও ৪৭ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে। ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মান। মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে বিশ্বের ১০৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯১তম। অন্যদিকে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডে ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৩তম।
গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা ও বিশ্বমানের ইন্টারনেট অভিজ্ঞতা দিতে যাদের সোচ্চার হওয়ার কথা সেই ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা-বিটিআরসিই নিরব। মাঝে মাঝে টেস্ট ড্রাইভের নামে লোক দেখানো কিছু কাজ ছাড়া বাস্তবে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না কেউই। তবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সবার কাছে দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি এখনো দেখা হয়নি, তাই এখনই কিছু বলতে পারছি না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইন্টারনেট সংযোগ ও গতির নাজুক অবস্থা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর দুর্বলতা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ, রফতানি, প্রযুক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণেও। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ক্যাশলেস সমাজ গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশে এখনই ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটানো প্রয়োজন।
ফাইবার এট হোমের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী বলেন, উচ্চগতি ও স্থিতিশীল ইন্টারনেট এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অবকাঠামো। পৃথিবীর প্রায় সব কার্যক্রমই এখন ইন্টারনেটনির্ভর। শুধু অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নয়, বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যও এর ওপর নির্ভরশীল। মানুষের মাঝে এখন ব্যান্ডউইথের চাইদা বাড়ছে। মানুষ ১০০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট চায়। বিশ্ব কোথায় থেকে কোথায় চলে যাচ্ছে? আমাদের সামানেও কিন্তু সেই সুযোগ অপেক্ষা করছে।
দেশের ইন্টারনেট গ্রাহকদের অভিযোগ, মোবাইল ফোন অপারেটরদের নামমাত্র ফোরজি ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইএসপি) কাগজ-কলমে উচ্চগতির ফাইবার ব্রডব্যান্ড থাকলেও বাস্তব চিত্রে গ্রাহক সেবার মান অত্যন্ত করুণ। চড়া দামে ডেটা প্যাক বা মাসিক বিল পরিশোধ করেও মিলছে না কাক্সিক্ষত স্পিড, উল্টো রয়েছে ধারাবাহিক নেটওয়ার্ক ড্রপ ও বাফারিংয়ের ভোগান্তি। মোবাইল অপারেটরগুলো সারা দেশে ১০০% ফোরজি কভারেজের দাবি করলেও, বাসাবাড়ির ভেতরে ঢুকলেই সংকেত উধাও হয়ে যায়।
কল ড্রপ এবং ইন্টারনেটের ধীরগতির কারণে অনলাইন ক্লাস, ই-কমার্স বা পেশাগত কাজে নিয়মিত ব্যাঘাত ঘটছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেনা ডেটা ব্যবহার করতে না পারলে মেয়াদ শেষে অব্যবহৃত ডেটা বাজেয়াপ্ত হওয়ার ক্ষোভ বহুদিনের। গ্রাহকদের সুবিধার্থে প্যাকেজের জটিলতা কমানোর নির্দেশনা থাকলেও পরোক্ষ খরচের বোঝা কমেনি। আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো ‘২০ এমবিপিএস’ বা ‘৫০ এমবিপিএস’ স্পিডের প্যাকেজ বিক্রি করলেও মূল আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ শেয়ারিংয়ের কারণে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে আসল গতি নেমে আসে এক-তৃতীয়াংশে। এছাড়া ঝোড়ো হাওয়া বা মেরামত কাজের নামে কথায় কথায় ঘণ্টা পর ঘণ্টা লাইন বিচ্ছিন্ন থাকা তো নৈমিত্তিক ঘটনা।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘দি আনফিনিশড ডিজিটাল রেভল্যুশন: এক্সপান্ডিং ইন্টারনেট অ্যাকসেস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চগতির ইন্টারনেট এখন আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি একটি দেশের উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। পুরো বাংলাদেশে ইন্টারনেটে সংযোগের আওতায় এলেও এখনো ব্যক্তিগত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে বলেছে, নেটওয়ার্ক দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছলেও উচ্চমূল্যের ডিভাইস, ডেটা প্যাকেজ ও ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতির কারণে অনেক মানুষ এখনো ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ফোরজি মোবাইল নেটওয়ার্ক দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীর আওতায় পৌঁছলেও বাস্তবে ইন্টারনেট ব্যবহার করত মাত্র ৫৩ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ নেটওয়ার্ক কাভারেজ থাকা সত্ত্বেও প্রতি নয়জনের মধ্যে তিনজন এখনো অনলাইনে নেই। এটা স্পষ্ট করে, কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই প্রকৃত ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না। নেটওয়ার্ক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে না, সে কারণগুলো বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কার্যকর ও ন্যায়সংগত নীতি ও উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের জন্য অর্থবহ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে এ প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত ও দূর করা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২৭টি দেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ জীবনে কখনো মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠায়নি; বাংলাদেশও এ তালিকায় রয়েছে
ওকলার তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে শীর্ষ দেশের মধ্যে- সংযুক্ত আরব আমিরাতে ডাউনলোড স্পিড ৭৬০ এমবিপিএস, কাতারে ৬২৬ এমবিপিএস, কুয়েতে ৪২৭ এমবিপিএস, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৭৩ এমবিপিএস, ব্রনাইয়ে ৩৩৫ এমবিপিএস, বাহরাইনে ৩২৫ এমবিপিএস, ব্রাজিলে ৩১৩ এমবিপিএস, সউদী আরবে ৩০২ এমবিপিএস। আর ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গতিতে শীর্ষ দেশের মধ্যে- সিঙ্গাপুরে ডাউনলোড স্পিড ৬৩৫ এমবিপিএস, ফ্রান্সে ৫৩৩ এমবিপিএস, চিলিতে ৫১৫ এমবিপিএস, সুইজারল্যান্ডে ৪৮৪ এমবিপিএস, হংকংয়ে ৪৬০ এমবিপিএস, আইসল্যান্ডে ৪৫৮ এমবিপিএস, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪১৭ এমবিপিএস, ম্যাকাওয়ে ৪০২ এমবিপিএস, যুক্তরাষ্ট্রে ৩৮৯ এমবিপিএস।
ভিয়েতনামে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ১৫৬-২০০ এমবিপিএস ও ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের গতি ২৮০-৩০৭ এমবিপিএস। ফাইবার অপটিক কভারেজ এবং দেশব্যাপী ফাইভ-জি সম্প্রসারণের ফলে ব্রডব্যান্ড গতিতে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে এই দেশটি। মালয়েশিয়ায় মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ১৫৫-২০১ এমবিপিএস এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ১৭৫-২৪২ এমবিপিএস। দ্রুতগতিসম্পন্ন ৫জি নেটওয়ার্ক রোলআউট এবং শক্তিশালী আইএসপি পরিকাঠামোর কারণে গতির দিক থেকে দেশটি অনেক এগিয়ে।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে- ভারতে মোবাইল ইন্টানেটের গতি ১৬৫ এমবিপিএস, শ্রীলংকার ১৩৯ এমবিপিএস, নেপাল ২৫-৩৫ এমবিপিএস এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ভারত ৬১ এমবিপিএস, শ্রীলংকা ৩৯ এমবিপিএস, নেপাল ৭৫-৮৫ এমবিপিএস। পাহাড়ি ভৌগলিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ফাইবার টু দ্যা হোম সম্প্রসারণের কারণে ব্রডব্যান্ড গতিতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ স্থানে রয়েছে নেপাল।
আর বাংলাদেশে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের জাতীয় মিডিয়ান স্পিড ৪০-৪৫ এমবিপিএস। এর মধ্যে আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো ১০ এমবিপিএস, ২০ এমবিপিএস বা ৫০ এমবিপিএস ইত্যাদি ব্যান্ডউইথের শেয়ারর্ড বা ডেডিকেটেড লাইন বিক্রি করে। অন্যদিকে মোবাইল ইন্টারনেটে জাতীয় মিডিয়ান স্পিড ২৮-৩২ এমবিপিএস।
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দেশের ইন্টারনেটের বেহাল দশা ও গতি নিয়ে বলেন যে, দেশের ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে ফাইভ-জি (৫জি) নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এবং ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারীকে ১০০ এমবিপিএস (১০০ এমবিপিএস) গতির ইন্টারনেট দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।