স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় সাফল্য পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ‘কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট’ (সেপা) নেগোসিয়েশন বা দরকষাকষি চূড়ান্ত করেছে সরকার।
প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য ১১১টি বিশেষায়িত সেবা খাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ কোরিয়ান বিনিয়োগকারী ও পরিষেবা প্রদানকারীদের জন্য ৯৫টি সেবা খাত উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রস্তাবিত সেপা চুক্তির অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে পঞ্চম ও শেষ রাউন্ডের আলোচনা চলে গত ২৭ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত। পাঁচ দিনের এই বৈঠকে দুই দেশের সরকারের প্রায় ৬০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। এর মধ্য দিয়ে প্রস্তাবিত চুক্তির বিষয়ে দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের দীর্ঘ ও কৌশলগত দরকষাকষি শেষ হয়। আলোচনার শেষ পর্যায়ে সেবা খাতসহ তিনটি ইস্যুতে মতভেদ দেখা দেওয়ায় আলোচনা আটকে যায়। শেষ দিন কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য তাদের ১১১টি বিশেষায়িত সেবা খাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়। চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকেই সেবা খাতে সর্বাধিক সুবিধা দিচ্ছে দেশটি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কোরিয়ান বাজারে এই ১১১টি সেবা খাত উন্মুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি (আইটি) ছাড়াও ইঞ্জিনিয়ারিং, শিপবিল্ডিং খাতের দক্ষ জনশক্তি দেশটিতে অবাধে কাজের সুযোগ পাবে। সিভিল, মেকানিক্যাল ও শিপবিল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি মেরিন টেকনিশিয়ানদের জন্য কোরিয়ায় সাময়িক ভিত্তিতে গিয়ে কাজ করার ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হবে। বাংলাদেশি সফটওয়্যার ফার্ম ও আইটি কোম্পানিগুলো কোরিয়ান করপোরেট খাতে সরাসরি ডেটা প্রসেসিং, ক্লাউড ম্যানেজমেন্ট ও সফটওয়্যার সেবা প্রদান করতে পারবে। এ ছাড়া কোরিয়ান সমাজে দক্ষ নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট ও কেয়ারগিভারদের জন্য আইনি কাঠামোর অধীনে বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
অপরদিকে সেপা চুক্তি সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও নির্মাণ সেবা যেমন- মেট্রোরেল, পোর্ট, এক্সপ্রেসওয়ে ও মেগা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বিশ্বখ্যাত কোরিয়ান প্রাক-প্রকৌশল কোম্পানিগুলো সরাসরি যুক্ত হতে পারবে। লজিস্টিকস ও টেলিকম খাতে বিশেষ করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর পরিচালনা, কনটেইনার টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট এবং ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক ও ডেটা সেন্টারে কোরিয়ান প্রযুক্তি সেবা সহজলভ্য হবে। এ ছাড়া ভোকেশনাল ট্রেনিং ও শিক্ষা খাতে কোরিয়ান বিখ্যাত ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলো বাংলাদেশে স্যাটেলাইট সেন্টার স্থাপন করে সরাসরি আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা প্রদান করতে পারবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), স্থানীয় ব্যাংক ও স্পর্শকাতর অর্থনৈতিক খাতগুলোকে সুরক্ষিত রেখে কোরিয়ার জন্য সেবা খাত উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূলত যেসব খাতে প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ও বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রয়োজন, কেবল সেগুলোতে কোরিয়াকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ইতিহাসে দক্ষিণ কোরিয়া এর আগে অন্য কোনো স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশের জন্য সেবা খাতে এত বিপুলসংখ্যক (১১১টি) সাব-সেক্টর একসঙ্গে কখনোই উন্মুক্ত করেনি। ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো যখন চুক্তি করে, তখন তারা ইতোমধ্যেই মধ্যম আয়ের দেশ ছিল। কিন্তু একটি উত্তরণমুখী এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ কোরিয়ার কাছ থেকে এই বিশাল সুবিধা আদায় করতে পেরেছে- যা এক অনন্য রেকর্ড।
সেপা চুক্তির দরকষাকষি সম্পন্ন করার যৌথ ঘোষণা : আগামীকাল ৪ আগস্ট ঢাকায় যৌথভাবে সেপা চুক্তির দরকষাকষি সম্পন্ন করার ঘোষণা দেবেন দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী। এরপর চুক্তির লক্ষ্যে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম শুরু হবে। জানা গেছে, সেপা চুক্তির বিষয়ে যৌথ ঘোষণা দিতে আজ ঢাকায় আসছেন দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হ্যান-কো ইয়ো। ৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও হ্যান-কো ইয়ো দুই দেশের পক্ষ থেকে যৌথভাবে সেপা চুক্তির দরকষাকষি সম্পন্ন করার ঘোষণা দেবেন।