শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকে আরও নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং বিনিয়োগকারীবান্ধব করতে বৈধ বিনিয়োগ পরামর্শক (ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজার) ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদলে নতুন নিয়ন্ত্রককাঠামো (রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক) প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। নতুন এ কাঠামোর আওতায় বিনিয়োগ পরামর্শ কার্যক্রমকে আইনি স্বীকৃতি প্রদান এবং এ খাতে জবাবদিহি ও পেশাদারি নিশ্চিত করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারগুলোতে বিনিয়োগ পরামর্শকদের জন্য পৃথক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, তদারকি ও কঠোর নীতিমালা রয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের কাঠামো চালু হলে দেশের পুঁজিবাজার আন্তর্জাতিক মানের নিয়ন্ত্রকব্যবস্থার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। বিএসইসির আইন বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি আদেশ ইতোমধ্যে জারি করা হয়েছে। এ আদেশে একটি কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। সে অনুযায়ী কমিটি আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনের কাছে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেবে।
এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেছেন, ‘বর্তমানে গবেষণা বিশ্লেষকদের বিধিমালা থাকলেও নিবন্ধন, অনুমতিপত্র প্রদান, নবায়ন ও তদারকির পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নেই। ফলে অনেকেই কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই বিনিয়োগসংক্রান্ত পরামর্শ দিচ্ছেন। এজন্য বিনিয়োগ পরামর্শক কাঠামো ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা হলে গবেষণাভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্য পরামর্শ পাওয়া যাবে এবং বাজার আরও সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ হবে।’ বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে সমাজমাধ্যমে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক গ্রুপ, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক বিনিয়োগসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তবে এসব পরামর্শদাতার বেশির ভাগেরই আইনি স্বীকৃতি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নেই। ফলে বিনিয়োগকারীরা যাচাইবাছাই ছাড়াই নানান ধরনের পরামর্শ অনুসরণ করে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনিয়ন্ত্রিত এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা অতিরঞ্জিত প্রচারণা ছড়িয়ে নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো বা কমানোর অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেন, আর সুযোগ নেয় একটি অসাধু চক্র।
বিভিন্ন সময় শেয়ার কারসাজি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালালেও কার্যকর আইনি কাঠামোর অভাবে স্থায়ী সমাধান হয় না। অতীতেও শেয়ারবাজারে গুজব ছড়িয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং দাম কারসাজির অভিযোগে একাধিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা নিয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ কয়েকটি কারসাজিকারী চক্র পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট শেয়ার নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে কৃত্রিম চাহিদা বা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পরে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সে ফাঁদে পা দিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
বিএসইসির নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত পরামর্শ কার্যক্রমকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় বিনিয়োগ পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে হলে নির্দিষ্ট যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক হতে পারে। পাশাপাশি তাদের জন্য আচরণবিধি, স্বচ্ছতা, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের মতো বিষয়গুলোও নির্ধারণ করা হবে। বর্তমানে কার্যকর থাকা গবেষণা বিশ্লেষক বিধিমালা-২০১৩-এ বিশ্লেষকদের সংজ্ঞা, যোগ্যতা, গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের মানদণ্ড, স্বার্থের সংঘাত, বিধিনিষেধ এবং গবেষণা পরিচালনার নীতিমালা নির্ধারিত রয়েছে।
এসব বিধির আওতায় গবেষণা বিশ্লেষকরা তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বিভিন্ন শিল্প খাত এবং শেয়ারবাজারের সামগ্রিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিনিয়োগ পরামর্শক ব্যবস্থা চালু হলে বিনিয়োগকারীরা নির্ভরযোগ্য ও পেশাদার পরামশর্ক পাবেন। একই সঙ্গে গুজবনির্ভর বিনিয়োগ কমবে এবং বাজারে জবাবদিহিমূলক পরামর্শ সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। এতে বাজারের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।