মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সাম্প্রতিক বন্যায় কৃষি, মৎস্য এবং প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৮৭৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে ৪৩টি জেলায় মোট আট লাখ ১৭ হাজার হেক্টর চাষাবাদ করা জমির মধ্যে ২৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। উৎপাদনের ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ ৩৩ হাজার ৯৭২ টন। আর্থিক হিসাবে যা ৪৭৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। :: পানি নেমে যাওয়ার পর দ্রুত নতুন বীজতলা তৈরি ও শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের বীজসহ অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সহায়তা করতে হবে Ñজাহাঙ্গীর আলম খান
ইনকিলাব রিপোর্ট
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষি খাত ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে সবজি ও মৌসুমি ফসলের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। ফলে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়ে গেছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এবারের বন্যায় আমন ধানের বীজতলা ও রোপণ করা চারা পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। আউশ ধান কাটার আগেই অনেক জমি প্লাবিত হওয়ায় ফলনের ক্ষতি হয়েছে।
পাট পানিতে ডুবে গাছ পচে যাওয়া ও আঁশের মান নষ্ট হয়েছে। সবজির মধ্যে বেগুন, ডাটা, মরিচ, টমেটো, ঢেঁড়স, শসা, কুমড়া, লাউসহ বিভিন্ন সবজি নষ্ট হয়েছে। ভুট্টা জমিতে দীর্ঘদিন পানি থাকায় গাছ ও শীষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডালজাতীয় ফসলের মুগ, মসুরসহ বিভিন্ন ডাল পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে আদা, হলুদ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও মরিচের ক্ষতি হয়েছে অনেক এলাকায়। এ ছাড়া ফলের বাগান যেমনÑ কলা, পেঁপে ও অন্যান্য ফলদগাছ উপড়ে যাওয়া বা জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের ক্ষতি-সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সাম্প্রতিক বন্যায় কৃষি, মৎস্য এবং প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৮৭৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে মৎস্য ও ফসলের ক্ষতি বেশি হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষিক্ষেত্রে ৪৩টি জেলায় মোট আট লাখ ১৭ হাজার হেক্টর চাষাবাদ করা জমির মধ্যে ২৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। উৎপাদনের ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ ৩৩ হাজার ৯৭২ টন। আর্থিক হিসাবে, যা ৪৭৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। অপরদিকে দেশের ৬০২টি ইউনিয়নে মৎস্য সম্পদের ক্ষতি ৩৬৯ কোটি টাকা এবং প্রাণিসম্পদে ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রীষ্মকালীন সবজির, যা মোট ক্ষতির প্রায় অর্ধেক। তথ্য বলছে, দুই লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমির শাকসবজির মধ্যে আট হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমির ৮৭ হাজার ৯৬৭ টন শাকসবজি নষ্ট হয়েছে। আর্থিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ২৩১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সবজির সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে টমেটো, বেগুন, শসা, কাঁচামরিচ, পটল, ঢেঁড়স, চালকুমড়া, করলা, কাঁকরোল, লাউসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। বন্যায় পরিবহন ব্যবস্থাও ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ আরো কমেছে, যা মূল্যবৃদ্ধিকে আরো উসকে দিয়েছে। দাম বৃদ্ধিতে নিম্ন আয়ের মানুষ সবজি কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষকরা উৎপাদন ক্ষতির কারণে আর্থিক সংকটে পড়েন। সব মিলিয়ে বলা যায়, উৎপাদক ও ভোক্তা উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং উন্নত বীজ ও কৃষি উপকরণ প্রদান করতে হবে। একই সাথে উৎপাদিত কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং বাজারে নিয়মিত তদারকি জোরদার করতে হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ফসল ও সবজির ক্ষতি দেশের কৃষি ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে সেটা খাদ্য নিরাপত্তায় বড় কোনো হুমকি নয়, বরং প্রধান শঙ্কা হলো বাজার কারসাজি। এই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সরবরাহ কিছুটা কমলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন কারসাজি করে দাম বাড়াতে না পারে, সে জন্য সরকারের শক্ত নজরদারি প্রয়োজন। বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা দরকার। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত। পানি নেমে যাওয়ার পর দ্রুত নতুন বীজতলা তৈরি ও শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের বীজসহ অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সহায়তা করতে হবে।
অতিবৃষ্টি ও বন্যায় সারাদেশে ক্ষয়-ক্ষতির সার্বিক অবস্থা নিয়ে আমাদের সংবাদদাতাদের পাঠানো রিপোর্ট নিচে তুলে ধরা হলো:
রফিকুল ইসলাম সেলিম, চট্টগ্রাম থেকে জানান, চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক টানা ভারী বর্ষণ, বন্যা আর পাহাড়ি ঢলে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারে ১৪০.৮২ কোটি টাকার গ্রীষ্মকালীন সবজি ভেসে গেছে। শাকসবজির ক্ষেত বিনষ্ট হয়েছে ৫৯০৭ হেক্টর জমির। এতে দুই জেলার ৬৩ হাজার ৮৭৫ জন সবজি চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে সবজি ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ-দোহাজারী, সাতকানিয়া, উত্তর চট্টগ্রামের হাটজাহারী, রাঙ্গুনিয়া, ফকিটছড়ি ও সীতাকুণ্ডের সবজি ক্ষেতের বেশি ক্ষতি হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের বাজারে। বাজারে একশ’ টাকার নিচে কোনো সবজি মিলছে না। চট্টগ্রামের সবজির বাজার পুরোপুরি কুমিল্লা ও বগুড়ানির্ভর হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ¦ালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন ভাড়া বেড়েছে, আবার রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে পরিবহন চলাচলও বিঘ্নিত হচ্ছে। আর এসব অজুহাতে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। তার প্রভাব পড়ছে সবজির দামে। এ অঞ্চলে মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ২১০ কোটি টাকা। খামারিদের পুকুর ও খামারের মাছ ভেসে গেছে। বাজারে মাছেরও সংকট রয়েছে। তাতে স্বল্প ও সীমিত আয়ের লোকজনকে সংসার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা সংবাদদাতা জানিয়েছেন, অতিবর্ষণে সীতাকুণ্ডে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সবজি চাষিরা। উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে ১৫শ’ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজির চাষ হয়। অতিবৃষ্টিতে ২৩৭ হেক্টরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১৭৩ হেক্টর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে ১৫শ’ টন সবজির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দুই হাজার কৃষক। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা রহমান ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষকদের আগাম রবি মৌসুমের সবজি চাষে এগিয়ে আসার পরামর্শ দেন।
স্টাফ রিপোর্টার, চাঁদপুর থেকে জানান, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও ভারী বর্ষণে চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষিজমি পানিবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এতে আমন ধানের বীজতলা, শাকসবজি, পাট এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত হলে ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে। পাশাপাশি কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কাউছার মাহমুদ, নরসিংদী থেকে জানান, সবজির ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত নরসিংদী জেলায় ভরা মৌসুমেও সবজির বাজারে আগুন। টানা বৃষ্টি ও ভারী বর্ষণে সবজি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়ায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমেছে। ফলে জেলার পাইকারি ও খুচরা দুই বাজারেই বেড়েছে সবজির দাম। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। কৃষকরা জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন এলাকার সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহও কমেছে। ফলে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। তবে উৎপাদন কম থাকায় অনেক কৃষকই বাড়তি দামের সুবিধা পুরোপুরি নিতে পারছেন না। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আজিজুল হক বলেন, ‘এ বছর সবজির আবাদ বেড়েছে। তবে ভারী বর্ষণ ও টানা বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ফলে বাজারে সবজির দামে প্রভাব পড়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এই ধকল কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা, বরগুনা থেকে জানান, টানা ১০ দিনের ভারী বৃষ্টি ও পানিবদ্ধতায় বরগুনা জেলার প্রায় ৩১০ হেক্টর সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে নিচু জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লাউ, শসা, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজির ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। কৃষকদের দাবি, এতে তাদের প্রায় কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে মাঠ থেকে সবজি সংগ্রহ ও বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জেলার বাজারগুলোতে সবজির দামও বেড়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। সরেজমিন বরগুনা সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, অনেক সবজি ক্ষেত এখনও পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। যেসব ক্ষেতে কিছু সবজি অবশিষ্ট আছে, সেখান থেকেও কাদামাটি ও পানিবদ্ধতার কারণে সময়মতো সবজি সংগ্রহ করা যায়নি। ফলে উৎপাদিত সবজির একটি অংশ ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে গেছে। বরগুনা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, একটানা বৃষ্টিতে সদর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছেন। পানি নেমে গেলে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হবে।
আক্তারুজ্জামান বাচ্চু, সাতক্ষীরা থেকে জানান, সাতক্ষীরায় অতিবৃষ্টিতে ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ধান ও সবজিক্ষেত রয়েছে। বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকা এসব ফসলের অধিকাংশই পচে গেছে। এছাড়া ১২৭টির অধিক মাছের ঘের ও পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় মাছ চাষিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত ১ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত একটানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলাসহ অন্যান্য উপজেলার বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা মারাত্মকভাবে পানিমগ্ন হয়ে পড়ে। এতে বাসিন্দারা কেনাকাটা, গবাদি পশুকে খাওয়ানো এবং সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার মতো দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ভেলা ও নৌকায় যাতায়াত করতে বাধ্য হয়েছেন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, শতাধিক মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, অতিবৃষ্টিতে ছয় হাজার হেক্টর আউশ ধান ও সবজিক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে। পচে গেছে ধানগাছ ও সবজি। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করার পাশাপাশি ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চলছে।
মো. জহিরুল হক, ভোলা থেকে জানান, জেলায় ধারাবাহিক বর্ষণে পানিবদ্ধতায় সবজি ও আমনের বীজতলা পচে গিয়ে ভোলার হাজার হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যার ফলে কৃষকের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে জেলার চরাঞ্চলের নিচু এলাকায় কয়েক দিনের বৃষ্টিতে এসব ক্ষেতখামার প্লাবিত হয়েছে বেশি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আমন বীজতলা ও সবজি চাষিরা। সবজিক্ষেত ও খামার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে করে আমন মৌসুমে চারা সংকট এবং সবজির দাম বাড়ার আশঙ্কায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি দেখা দিয়েছে। ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, যার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে বীজতলাসহ শাকসবজি অনেক ক্ষতি হয়েছে।
দুলাল হোসেন, লালমনিরহাট থেকে জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কৃষকেরা ক্ষেত থেকে চাহিদা অনুযায়ী সবজি তুলতে পারেননি। অনেক জমিতে পানি জমে সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। আবার কিছু এলাকায় বন্যার পানিতে সবজির ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। ফলে লালমনিরহাটে বেড়েছে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম।
আনোয়ার জাহিদ, ফরিদপুর থেকে জানান, ফরিদপুর কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টির প্রভাবে গত ৬-৭ দিনের বর্ষণে ফরিদপুর সদর, নগরকান্দা, সালথা, সদরপুর, চরভদ্রাসন, মধুখালীসহ সদর থানার চারটি চরাঞ্চলের বাদাম, কাঁচামরিচ, পোটল, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়াসহ কাঁচা সবজির দাম আগুন সমান দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সরেজমিন গতকাল দেখা যায়, ফরিদপুর হাজী শরীয়য়তুল্লাহ বাজার, হেলিপ্যাড বাজার, জানাইপুর বাজারের প্রায় প্রতিটি সবজির দামই সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, অতিবৃষ্টি ও পানিবদ্ধতার কারণে মাঠের ফসল নষ্ট হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে কাঁচামরিচের গাছ পচে যাচ্ছে। ফলে সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে সবজি ক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে বেশি। লাগাতার বৃষ্টিতে সবজিগাছ নষ্ট হয়েছে। এতে করে বাজারে সব সবজির দাম বেড়েছে।
ফিরোজুর রহমান, মেহেরপুর থেকে জানান, একটানা অতিবৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যায় সবজিক্ষেতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য জেলার মতো মেহেরপুরে কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন শাকসবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সঞ্জীব মৃধা বলেন, অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় শাকসবজির ক্ষতি হয়েছে। তবে মাঠের পানি নেমে গেলে উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ বাড়বে। এতে কাঁচামরিচসহ অন্যান্য সবজির দামও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে।
সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বন্যার পানি নেমে গেলেও কমেনি সাঙ্গু নদীর তাণ্ডব। চরতী ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙনে প্রতিদিনই বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতবাড়ি, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ। বন্যার পানি নেমে গেলেও ভয়াল রূপ ধারণ করেছে সাঙ্গু নদী। সাতকানিয়ার চরতী ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে অব্যাহত নদীভাঙনে প্রতিদিনই নদীতে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট। নদীর তীরজুড়ে এখন শুধু আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীপাড়া এলাকায় ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। এখন ঝুঁকিতে রয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি। সেনেরচরেও ভাঙনের কবলে পড়েছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।
ফয়সাল আমীন, সিলেট থেকে জানান, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে গ্রীষ্মকালীন সবজি ও আউশ ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানিবদ্ধতা ও পচন ধরার কারণে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গেছে এবং একই সাথে দাম বেড়ে গেছে অনেক । ক্ষতির প্রধান কারণ পানিবদ্ধতা ও পচন: অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ক্ষেতের ভেতর পানি জমে পটল, করলা, মরিচ এবং অন্যান্য মৌসুমি সবজি গাছ গেছে পচে। এছাড়া আউশ ধান এবং বীজতলা পানির নিচে গেছে তলিয়ে। এতে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ কৃষকরা। ক্ষেতের ফসল নষ্ট হওয়ায় স্থানীয় হাট-বাজারে সবজির সরবরাহ কমেছে। বাজারে প্রায় সব ধরনের শাকসবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
অপরদিকে, হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজি চাষে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। অতিবৃষ্টিতে শত শত একর জমির শসা, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, লাউ, কুমড়া, টমেটো, বরবটি ও অন্যান্য মৌসুমি সবজির খেত নষ্ট হয়ে গেছে। এতে উপজেলার শতাধিক কৃষক লাখ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তাপস দেব বলেন, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সবজি গাছের শিকড়ে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়। ফলে গাছ দ্রুত পচে যায় এবং বিভিন্ন ছত্রাক জনিত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
আবু হেনা মুক্তি জানান, বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে টানা ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে গ্রীষ্মকালীন সবজি খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যার ফলে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে দাম প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটার মতো প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো থেকে সবজি পরিবহনের খরচ প্রায় ৫০% বেড়ে গেছে। একটানা বৃষ্টির পানি জমে নিচু জমির লাউ, শসা, করলা, বেগুন ও মরিচের খেত সম্পূর্ণ পচে গেছে। বৃষ্টির কারণে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় এবং শ্রমিক সংকট তৈরি হওয়ায় সবজি পরিবহনের খরচ প্রায় ৫০% বেড়েছে।
এদিকে গত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিক অতি বৃষ্টিতে খুলনা বিভাগের চার জেলায় আট হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষকের নানা ধরনের সবজি মাঠেই পঁচেছে। এসব জেলায় ৩৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ চার কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হচ্ছে, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও নড়াইল।
ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো হচ্ছে, তেরখাদা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, ফুলতলা, দিঘলিয়া, দাকোপ, বাগেরহাটের সদর, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, চিতলমারী, নড়াইল সদর, লোহাগড়া, কালিয়া ও সাতক্ষীরা জেলা সদর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী তরমুজ, কাঁচামরিচ, পান, ঢেঁড়স, পুঁইশাক, ঝিঙে, উচ্ছে, বেগুন ও করলা সবজি খেতেই পঁচেছে।
এই বিষয়ে খুলনা অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, এসব জেলায় ১৩ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে নানা জাতের ফসলের মধ্যে ৩৮৬ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খেতে পঁচে যাওয়া ফসলের মূল্য চার কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
এহসানুল আলম খসরু, নোয়াখালী থেকে জানান, নোয়াখালী জেলার ৯টি উপজেলায় অতি বৃষ্টিতে নিমজ্জিত ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩০৩ কোটি ৫০ লাখ ৭ হাজার ৮৭২ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ- ৩৫৭৭.৮ হেক্টর জমি, মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৩৮,৫৬৪ জন বলে কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ গত ১৪ জুলাই পর্যন্ত নোয়াখালী কৃষি বিভাগ নিরপণ করেছে।
নোয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশীষ কুমার কর জানান, গত ১৪ জুলাই পর্যন্ত অতিবর্ষণে বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্বলিত একটি প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে।
পটুয়াখালী জেলা সংবাদদাতা জানান, একটানা প্রবল বর্ষণ ও জোয়ারের পানির প্রভাবে পটুয়াখালী জেলায় আমন বীজতলা সহ শাকসবজি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সূত্রমতে, জেলায় ৯৭০ রোপাআমন বীজতলার মধ্যে ৯৭০ হেক্টরই আক্রান্ত হয়েছে, ১০ হাজার ৪১৭ হেক্টর আউশ আবাদের মধ্যে ৫২০ হেক্টর, ৮৫০ হেক্টর শাকসবজির মধ্যে ৮৫০ হেক্টর, পাট ২৫ হেক্টরের মধ্যে ৫ হেক্টর, পেঁপে ২২০ হেক্টরের মধ্যে ১২০ হেক্টর, কলা ২৫০ হেক্টর এর মধ্যে ৮০ হেক্টর, পান ৬১২ হেক্টরের মধ্যে ২৫ হেক্টর, সাম্মাম ৬০ হেক্টরের মধ্যে ৪০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন মরিচ ৪ হেক্টরের মধ্যে প্রায় এক হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন তরমুজ ৪ হেক্টর এর মধ্যে ৪ হেক্টরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।