Image description

সমাজমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, ভুয়া অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেল, ফেসবুক আইডি হ্যাক ও অনলাইনে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কিংবা সাইবার বুলিং- এসব সর্বনাশা ঘটনা এখন অনেক তরুণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইবার জগতে অপমান, ভয়ভীতি ও সামাজিক লাঞ্ছনার মুখে পড়ে একের পর এক তরুণী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পুলিশি তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাইবার বুলিং, অনলাইনে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করে ব্ল্যাকমেল কিংবা সমাজমাধ্যমে অপমানজনক প্রচারণার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্তত ৩০টি আত্মহত্যার ঘটনা সামনে এসেছে।

এসব ঘটনার বেশির ভাগ ভুক্তভোগীর বয়স ছিল ১৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার হয়রানি কখনো একক কারণ নয়, বরং পারিবারিক চাপ, সামাজিক লজ্জা, মানসিক বিষণ্নতা ও ডিজিটাল অপমান মিলেই অনেককে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কলেজছাত্রী নন্দিতা চৌধুরী আত্মহত্যা করেন। পরিবারের অভিযোগ, অজ্ঞাত ব্যক্তি তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে আপত্তিকর পোস্ট ছড়িয়ে দেয়। বিয়ের মাত্র পাঁচ দিন আগে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। মৃত্যুর আগের দিন থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন। এর কয়েক মাস পর ২০২১ সালের ৫ জুলাই রাজধানীর সবুজবাগে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ১৪ বছরের ঊর্মি আত্মহত্যা করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, দুই যুবক তার ছবি ব্যবহার করে ভুয়া অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় এবং ২০ হাজার টাকা দাবি করে। পরিবারের সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আত্মহত্যা করে। পরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ও দণ্ডবিধিতে মামলা হয়, যা বর্তমানে বিচারাধীন।

২০২২ সালেও একাধিক তরুণীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছন্দা রায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান, আইনজীবী মিতু ফকির এবং কিশোরী কবিতা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যার বিষয়টি উঠে এলেও, এসব ঘটনার নেপথ্যে মানসিক চাপ, পারিবারিক সংকট অথবা অন্য কোনো সামাজিক কারণ ছিল কি না? সেসব নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে তাদের স্বজনরা সাইবার বুলিং এবং ব্লাকমেলিংয়ের অভিযোগ করেছেন।

গত বছরের ১৫ মার্চ পটুয়াখালীর বাউফলে ১৬ বছর বয়সি এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করে। পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের উত্যক্তের একপর্যায়ে এক তরুণ তার ছবি ফেসবুকে আপত্তিকর মন্তব্যসহ প্রকাশ করে। অপমান সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যার আগে চিরকুটে লিখে যায়, তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়েছে। এর মাত্র চার দিন পর ১৯ মার্চ গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের দাবি, বিদ্যালয়ের নামে পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজে শ্রেণিকক্ষের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে।

ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমাজমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়া, অনলাইনে অপমান, ব্ল্যাকমেল কিংবা ডিজিটাল হয়রানি একটি বড় মানসিক অভিঘাত তৈরি করেছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ খান বলেন, আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে বিষণ্নতায় ভোগেন। সাইবার বুলিংয়ের ঘটনাও বর্তমানে আত্মহত্যার অন্যতম ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরাও ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর একটি অংশের সঙ্গে সাইবার হয়রানির সম্পর্ক পাওয়া যায়।

এদিকে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিবছর ৫০০ থেকে ৭০০ নারী হত্যা বা আত্মহত্যার শিকার হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক, যৌন হয়রানি, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সামাজিক নির্যাতন এসব ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্যানুযায়ী, দেশে সাইবার অপরাধের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৫০ দশমিক ২৭ শতাংশ ভুক্তভোগী সাইবার বুলিং ও হয়রানির শিকার।

এসব অপরাধের ক্ষেত্রে শতকরা প্রায় ৮০ শতাংশ শিকারই নারী ও কিশোরী। সাইবার অপরাধের প্রায় ৫০.২৭ শতাংশ হলো সাইবার বুলিং। বুলিং ও ব্ল্যাকমেলিংয়ের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী ও কিশোরী। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ তরুণ-তরুণী, বিশেষ করে ১৪ থেকে ২৩ বছর বয়সি।

সংস্থাটির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবু তালেব বলেন, সাইবারের হয়রানির শিকার বেশির ভাগই আইনের আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

যে কারণে বেশির ভাগ অভিযুক্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন।