রাজধানীর মিরপুরে সম্প্রতি এলাকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার ও স্বার্থের বিরোধের জেরে ‘কিলার গ্রুপের’ শ্যুটারদের গুলিতে যুবদলকর্মী ইউসুফ খুন হয়েছেন। গত ২৪ জুলাই রাত ১১টার পর এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
পুলিশ বলছে, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে ভাড়াটে খুনিদের লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে ইউসুফ খুন হন। এ হত্যাকাণ্ডে দক্ষিণাঞ্চলের কিলার গ্রুপের সদস্যদের ২৫ লাখ টাকায় ভাড়া করার অভিযোগ উঠেছে একই থানার স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজের বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য, এলাকায় ডিশ ব্যবসা, ময়লার টেন্ডার, ফুটপাত দখল, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ—এসব থেকে দুজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় এবং তা চরমে পৌঁছে।
সম্প্রতি এভাবে রাজনৈতিক বিরোধ ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে খুনের ঘটনা বেড়েছে।
সর্বশেষ গত জুলাই মাসে সারা দেশে অভ্যন্তরীণ বিরোধে রাজনৈতিক সহিংসতায় সাতজন নিহত হয়। গতকাল মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, মাদক কারবার, ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব, অর্থের ভাগবাটোয়ারা ও চাঁদাবাজি ঘিরে বিরোধের জেরে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। তদন্তে নেমে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বাড়ার আশঙ্কায় আটটি ক্রাইম বিভাগের ৫০ থানার ওসিদের সতর্ক করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ বিরোধে গত ছয় মাসে শতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া চাঁদাবাজি, দলীয় কোন্দল ও অন্তঃকোন্দলে ৯ শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর এলাকায় আধিপত্য নিয়ে বিরোধে বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন হাফিজ।
ঘটনার পর থেকে পরিকল্পনাকারী হাফিজুর পলাতক রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সিএনজি হাফিজ যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার জন্য ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের ভাড়া করেন।
ডিএমপির তথ্য যা বলছে : ডিএমপির (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) মাসিক অপরাধমূলক প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত) রাজধানীতে ১০২ জনকে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১, ফেব্রুয়ারিতে ১৬, মার্চে ২৪, এপ্রিলে ২৫ ও মেতে ১৬ জনকে হত্যা করা হয়।
এর আগে গত বছরের ১১ মাসে (জানুয়ারি থেকে নভেম্বর) ৩৯৪ জনকে হত্যার ঘটনায় মামলা হয় ডিএমপির সব থানায়। এই হিসাবে প্রতি মাসে ৩৫ জনের বেশি হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন টার্গেট কিলিংয়ের শিকার।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় হত্যা মামলা হয়েছে এক হাজার ৭২৭টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫২, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মেতে ৩১০ ও জুনে ৩২৩টি হত্যা মামলা করা হয়।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত মার্চ ও এপ্রিলে নথিভুক্ত হওয়া প্রায় ৬০০ হত্যা মামলা তদন্তে উঠে এসেছে। পূর্বশত্রুতার কারণে ৩৬৬টি অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে হত্যার ঘটনা ঘটে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটে অভ্যন্তরীণ ও ব্যক্তিগত এবং অর্থনৈতিক বিরোধের জেরে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়েও ব্যক্তিগত বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় সেটি সামনে চলে আসে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, রাজনৈতিক বিরোধের চেয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, দরপত্র (টেন্ডার) নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলই এসব রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মূল কারণ।
ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড সমাজে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে : মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জাুনয়ারি-থেকে জুন) আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলীয় কোন্দল ও অন্তঃকোন্দলে ৫৬ জন রাজনৈতিক নেতা নিহত হন। এ সময়ে রাজনৈতিক দলের পাঁচ হাজার ২৪৬ জনের বেশি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত ও হামলার শিকার হয়েছে।
নিহত ৫৬ জনের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন (৬৬%), জামায়াতের ছয়জন (১১%) এবং আওয়ামী লীগের তিনজন রয়েছেন। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনার ৬৭৩টিই (৮১%) ঘটেছে বিএনপির অন্তঃকোন্দলে। এর বাইরে বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিরোধের জেরেও অনেক ঘটনা ঘটে।
ছয় মাসে সহিংসতার ৮৩০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তঃকোন্দলের ২৭৩টি ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত দুই হাজার ৯২ জন ও নিহত ৩১ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ২৯০টি ঘটনায় আহত হয়েছে এক হাজার ৮৫২ জন ও নিহত ১০ জন, বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ৭৭টি ঘটনায় আহত ৪৬৪ জন এবং নিহত হয়েছে সাতজন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষে আহত হয়েছে ২৫০ জন, আওয়ামী লীগ-এনসিপির তিনটি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত ৫১ জন, বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষের ৯৭টি ঘটনায় আহত হয়েছে ২৫১ জন।
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৬৪টি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব হামলায় কমপক্ষে ৩৮ জন নিহত ও ৯০ জন আহত হয়েছে। নিহত ৩৮ জনের মধ্যে বিএনপির ২০ জন, আওয়ামী লীগের ৯ জন, জামায়াতের চারজন ও অন্যান্য দলের পাঁচজন সদস্য।
গোয়েন্দা সতর্কবার্তার পর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক জরুরি বৈঠক করেছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুর এলাকার এক রাজনৈতিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁকেও সম্প্রতি সন্ত্রাসীরা প্রাণনাশের হুমকি দেয়। তিনি পুলিশকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়ে রেখেছেন।
ডিএমপিতে আরো যেসব হত্যা : রাজধানীর অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণকারী আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে আলাদা ‘শ্যুটার’ রয়েছে জানিয়ে ডিবি সূত্র বলছে, তারা সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন, তারিক সাইফ মামুন, ইয়াছিন খান ওরফে কাইল্লা পলাশসহ আরো অনেককে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারসহ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে হত্যা করে।
এর আগে গত ২১ জুলাই রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় মো. পলাশ নামের স্থানীয় বিএনপির এক কর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।