Image description

‘ টিভিতে খবরে শুনছি । কিন্তু আমার দোকানে এখনো এইটা ( বাংলা কিউআর কোড ) কেউ দিয়া যায় নাই । মানুষ এইভাবে টাকা দিতেও চায় না । ' বাংলা কিউআর কোড ব্যবহারে লেনদেন প্রসঙ্গে সাফ জবাব রাজধানীর বনশ্রী এলাকার মুদিদোকানি আল - আমীনের । আল - আমীনের মতো দেশের বেশির ভাগ মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে বাংলা কিউআর এখনো পরিচিত বা নিয়মিত ব্যবহারের মাধ্যম হয়ে ওঠেনি । অথচ ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বাংলা কিউআর ( কুইক রেসপন্স ) কোড বাধ্যতামূলক ও সর্বজনীন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক । কিন্তু এই ব্যবস্থার মাশুল , হিসাব খোলার জটিলতা , স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার , ইন্টারনেটের উচ্চ মূল্যসহ নানা বাধায় তা সর্বজনীন ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারছে না বলে মত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ।

সর্বজনীন ডিজিটাল লেনদেন

লেনদেন দিনে গড়ে ৩৫-৩৭ হাজার টাকার হিসাবে ১১-১২ কোটি ব্যাংকের কার্ড ও এমএফএস দৈনিক ডিজিটাল লেনদেন ৩৪০ কোটি টাকা ব্যবসায়ীরা বলছেন , বাংলা কিউআরে ১ শতাংশ মাশুল গুনতে হয় । এ কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকে এই লেনদেনে অনাগ্রহী । তা ছাড়া কিউআরে হিসাব খোলার প্রক্রিয়াটি এখনো পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি । ফলে অনেক বিক্রেতা প্রয়োজনীয় নথিপত্রের

বাংলা কিউআরের বাধা ১ % মাশুল গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের । ডিজিটাল হয়নি হিসাব খোলার প্রক্রিয়াও ।

অভাবে হিসাব খুলতে পারছেন না । বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন , বাংলা কিউআরে মাধ্যমে লেনদেনে বিক্রেতাদের বাধ্যতামূলক ১ শতাংশ মাশুল দিতে হয় । ১ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করে

বাংলা কিউআরে টাকা নিলে বিক্রেতা পাবেন ৯৯০ টাকা । টাকার পরিমাণ কম হতে পারে , কিন্তু একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই টাকা কেন মাশুল দিতে রাজি হবেন ? খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে , বর্তমানে দেশজুড়ে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে দিনে গড়ে ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার লেনদেন হচ্ছে । এই মাধ্যমে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ১১ থেকে ১২ কোটি টাকা । অন্যদিকে ব্যাংকের কার্ড ও এমএফএস গ্রাহকেরা দৈনিক ৩৪০ কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন করে থাকেন । সেই হিসাবে ডিজিটাল লেনদেনের বড় অংশ এখনো কিউআর কোডের আওতায় আসেনি । দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী , দেশে প্রায় ১ কোটির মতো বৃহৎ , মাঝারি , ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা দোকান রয়েছে । খুব কম দোকানে কিউআর পৌঁছেছে

মাশুলে ভুগছে বাংলা কিউআর

বলে মত সভাপতি হেলাল উদ্দিনের । তিনি বলেন , “ এটা চালুর আগে ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার ছিল । টাকা কীভাবে নিতে হবে , কত দিন পর বা কীভাবে টাকা উত্তোলন করা যাবে , এটিতে খরচ কেমন হবে — এ বিষয়গুলো ব্যবসায়ীদের জানানো দরকার ছিল । কিন্তু আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি । ’ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন , দেশে স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার , ইন্টারনেটের উচ্চ মূল্য , অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বাংলা কিউআরে লেনদেনের ক্ষেত্রে বড় বাধা ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ( বিবিএস ) তথ্য অনুযায়ী , বর্তমানে দেশে নিজের মোবাইল ফোন আছে , এমন মানুষ ৫৭ শতাংশ । আর প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে না । এর মধ্যে অনেকে আছেন , যাঁরা বাসায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের আওতায় থাকলেও ঘরের বাইরে বের হলে মোবাইল ইন্টারনেটে যুক্ত হন না । তাঁরা কিউআরে লেনদেনে আগ্রহী নন । বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল , চর ও পাহাড়ি এলাকা ; নিম্ন আয়ের পরিবার ; বয়স্ক নাগরিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার তুলনামূলক কম । ফলে বড় একটি জনগোষ্ঠী বাংলা কিউআর ব্যবহারের বাইরে রয়েছে । অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সুরাইয়া আক্তার বলেন , “ আমি বাসায় ওয়াই - ফাই ব্যবহার করি । সেটার জন্য বিল পরিশোধ করি । 

এখন আমাকে যদি কিউআরে কেনাকাটা করতে হয় , তাহলে আলাদা করে আবার মোবাইল ইন্টারনেটের প্যাকেজ নিতে হবে । সেই বাড়তি খরচ কেন করব ? ” বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন ( বিএমপিসিএ ) মনে করে , বাংলা কিউআর লেনদেনে ১ শতাংশ মাশুল বা চার্জ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে । ফলে অনেক ব্যবসায়ী কিউআর পেমেন্ট গ্রহণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন , যা ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে । 

বিএমপিসিএর সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন , বিশ্বের বহু দেশ ডিজিটাল লেনদেনকে জনপ্রিয় করতে কিউআর - ভিত্তিক পেমেন্টে অত্যন্ত কম বা শূন্য ফি নীতি অনুসরণ করেছে । ভারতের ইউপিআইতে অধিকাংশ সাধারণ লেনদেনে মার্চেন্টের জন্য মাশুল শূন্য । থাইল্যান্ডের প্রম্পট পে , সিঙ্গাপুরের পেনাও এবং মালয়েশিয়ার ড্রইটনাউ কিউআরেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফি শূন্য বা অত্যন্ত কম রাখা হয়েছে । ইন্দোনেশিয়ায়ও ফি বাংলাদেশের তুলনায় কম । এই নীতিগত সহায়তার ফলে এসব দেশে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নগদ অর্থের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে । অপর দিকে বাংলাদেশে বাংলা কিউআর লেনদেনে মার্চেন্টদের ১

শতাংশ মাশুল গুনতে হচ্ছে । এই অতিরিক্ত ব্যয় ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে নিরুৎসাহ সৃষ্টি করছে । এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন , ‘ ডিজিটাল লেনদেন সহজ ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলা বাংলা কিউআর সর্বজনীন করা হয়েছে । এটা বিশাল কর্মযজ্ঞ । আমরা নিয়মিত মনিটর করছি । কিউআর লেনদেনের তথ্য এমএফএস ( মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ) থেকে নিচ্ছি । সেগুলো যাচাই করছি । তাদেরকে বলছি , লেনদেন আরও বাড়াতে হবে । তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে । এগুলো নিয়ে প্রতিদিন কোনো না কোনো মিটিং হচ্ছে ।

' ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে রাজধানীর মতিঝিলে ‘ বাংলা কিউআর ' চালু হয় । ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে সব ব্যাংক , পিএসপি ( পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার ) , পিএসও ( পেমেন্ট সার্ভিস অপারেটর ) এবং এমএফএস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক আন্তলেনদেন শুরু হয় । লেনদেনের বড় মাধ্যম স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ । গত ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । একাধিক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী , দেশজুড়ে কিউআর কোডের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ । এর মধ্যে বিকাশের অ্যাপ ৫ লাখ ।

ডাচ্‌ - বাংলা ব্যাংকের অ্যাপ ২ লাখ ৭০ হাজার ( রকেটসহ ) , পূবালী ব্যাংকের ১ লাখ ৯০ হাজার , ইসলামী ব্যাংকের ৮০ হাজার , সোনালী ব্যাংকের ৫৪ হাজার , মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫০ হাজার এবং সিটি ব্যাংকের ৩৮ হাজার কিউআর কোড রয়েছে । বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন , এক দেশ , এক কিউআর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক । তাঁর মতে , কিউআর স্টিকারটা পরিবর্তন করা এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সহজ অংশ । সবচেয়ে বড় কাজ হলো জাতীয় পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আন্তসংযুক্ত ( ইন্টার - অপারেবিলিটি ) করা । 

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন , বর্তমানে দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্কে বিভক্ত । একটি জাতীয় পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে সবার সঙ্গে সবার লেনদেন নিশ্চিত করতে হবে । পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন , জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন কার্যকর করা , ডেটা গভর্ন্যান্স জোরদার করা , ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার ( এনইআইআর ) চালু করা এবং সহজ কিস্তিতে স্মার্টফোনের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে । এসব পদক্ষেপ ছাড়া প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না বলে মনে করেন তিনি ।