Image description
খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল নিয়ে সিডিপির গবেষণা

দেশে মানুষের আয় সেই অর্থে বাড়ছে না, দিন দিন যতটা বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। পরিস্থিতি এমন যে নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের ৬০ শতাংশই চলে যাচ্ছে খাবার কিনতে। অথচ গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কৃষক বা খামারির কাছ থেকে খাদ্যপণ্য ভোক্তার কাছে আসতে ঘাটে ঘাটে বেড়ে দাম হয়ে যাচ্ছে দ্বিগুণ। উৎপাদক দাম পাচ্ছেন না, ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠছে। কিন্তু লাভের বড় অংশ কোলে টানছে আড়তদার আর মধ্যস্বত্তভোগী সিন্ডিকেট।

দেশের খাদ্যপণ্যের বাজারব্যবস্থার এমন চিত্রই উঠে এসেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায়। ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফার ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। এ উপলক্ষে রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি।

সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন কৃষিবিদ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা-অধিকারের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টজনেরা।

সংলাপটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি আমাদের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে।

গবেষণায় দাম বাড়ার কারণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে দাম বাড়াকে কেবল উৎপাদন খরচ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ে শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেট। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্যের যে দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থা, সেখানে কমিশন এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া দৌরাত্ম্য রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় আমদানিকারক অনেকেই একে অপরের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বা সিন্ডিকেট করে দাম নির্ধারণ করে দেয়। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব দেখা দেয় এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছৈমতো দাম হাঁকাতে পারে।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর। তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় করে খাদ্য কিনতে। সেখানে ধনী ৫ শতাংশ পরিবার ব্যয় করে মাত্র ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন আয়ের লোকজনই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।

সংলাপে বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। পাশে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান। গতকাল রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে। ছবি: আজকের পত্রিকা
সংলাপে বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। পাশে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান। গতকাল রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখনো খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে ফখরুদ্দিন আল কবীর বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় মানুষকে সঞ্চয় ভাঙতে বা ঋণ নিতে হচ্ছে, যা দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হয়। ওই চাল ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ঘুরে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা। তার মানে, কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম বেড়ে যাচ্ছে ৯৫ শতাংশ।

একইভাবে কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে আসতে মসুর ডালের দাম বাড়ছে ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচে ১১৬ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ, মাছে ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগিতে দাম বাড়ছে ২২ শতাংশ।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানো, পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা জোরদার করা, পণ্যের দামের স্বচ্ছতা বাড়ানো, হিমাগার ও কোল্ড-চেইন পরিকাঠামো বিস্তার করা, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি বাজার সংযোগ স্থাপন করা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং প্রমাণিত মজুতদারি, সিন্ডিকেট বা অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, করোনার সময় বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও পরে কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশে কমছে না। বাংলাদেশে ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকার অন্যতন কারণ হলো এ দেশে উপকরণগত খরচ বেশি।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কেউ কেউ চাঁদাবাজি বন্ধের কথা বলেন, আমি বলি ‘হিসাববহির্ভূত’ খরচ কমাতে হবে। আমরা উৎপাদনের শুরু থেকে বাজার পর্যন্ত আসা পর্যন্ত প্রতিটি স্তর চিহ্নিত করছি, কোথায় সমস্যা আছে দেখছি।’

খাদ্যনিরাপত্তা বাড়াতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে বলে জানান কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘আমার গবেষণা জীবনের শুরুতেও দেখেছি সাধারণ মানুষের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে, যা প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ। দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনও নিম্ন আয়ের মানুষকে আয়ের ৬০ শতাংশ ব্যয় করতে হচ্ছে খাদ্যের পেছনে। প্রশ্ন হচ্ছে, এতটা পথ পাড়ি দেওয়ার পরেও কেন পরিস্থিতির উত্তরণ হলো না?’

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘৫৪ বছর ধরে আমাদের খাদ্যপণ্য উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের ওপরে থাকলেও বর্তমানে তা কিছুটা কমে ২ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। উৎপাদন কম হলে বিভিন্ন স্তরে দাম বাড়ানোর সুযোগ পায় মধ্যস্বতভোগীরা। ফলে তিন বছর ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চহারেই বিরাজ করছে। তাই উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সরকারকে বেশি জোর দিতে হবে।’

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. সাহাবুদ্দিন সরকার এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার লিমা।