Image description

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তীব্র তাপপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য নতুন এক কাঠামোগত ঝুঁকি হয়ে উঠছে । এতে কমছে শ্রমিকের কর্মক্ষমতা , ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন , বাড়ছে ব্যবসার ব্যয় , হারাচ্ছে কোটি কোটি কর্মঘণ্টা । বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে এসব কথা জানিয়ে বলা হয়েছে , এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে । ‘ বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ : দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুরক্ষা ' শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদনটি গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা অফিসে প্রকাশ করা হয় । প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু জলবায়ু বা পরিবেশগত সংকট নয় ; এটি ব্যবসা , শিল্প , কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ । উচ্চ তাপমাত্রার কারণে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমছে , উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে , সরবরাহ

তাপপ্রবাহের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংক » বছরে ৩.১ কোটি কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি । » ২৮ কোটি নতুন কর্মক্ষম মানুষের সম্ভাবনা হুমকিতে । » ৫২ কোটি মানুষ অন্তত ১ মাস তীব্র তাপপ্রবাহে ভুগতে পারে । » তাপপ্রবাহকে উন্নয়ন পরিকল্পনার বিবেচনায় রাখার পরামর্শ । ব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে । একই সঙ্গে শহরগুলোর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপরও চাপ বাড়ছে । প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে , ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন করে প্রায় ২৮ কোটি কর্মক্ষম মানুষ যুক্ত হওয়ার কথা । কিন্তু বাড়তে থাকা তাপমাত্রা সেই জনমিতিক সম্ভাবনাকে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলছে । যে বয়স শ্রেণির জনশক্তি ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হওয়ার কথা , তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে তাদের উৎপাদনশীলতা সবচেয়ে বেশি

ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে । এভাবে বাড়তি তাপের প্রভাবে প্রতিবছর হারিয়ে যেতে পারে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ কর্মসংস্থান । বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী , ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারে । এটি বর্তমানের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি । সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে নিম্ন আয়ের পরিবার , অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক , নারী , বয়স্ক এবং শিশুরা । ফলে সামাজিক বৈষম্যের পাশাপাশি অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ আরও বাড়তে পারে ।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেন , এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র দেশের শহরগুলো । কিন্তু ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কর্মসংস্থান , জীবিকা ও প্রবৃদ্ধিকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলছে । তাঁর মতে , তাপ - সহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে শারীরিকভাবে সুরক্ষিত রাখার বিষয় নয় ; এটি কর্মসংস্থান রক্ষা , উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি , বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করারও পূর্বশর্ত । প্রতিবেদনে তাপপ্রবাহকে আর মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে না দেখে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক । নগর - পরিকল্পনা , অবকাঠামো উন্নয়ন , শিল্পনীতি এবং সরকারি - বেসরকারি বিনিয়োগ কৌশলে তাপ - সহনশীলতা যুক্ত করার পাশাপাশি তাপ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ , হিট অ্যাকশন প্ল্যান শক্তিশালী করা , ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের সুরক্ষা , জ্বালানি - সাশ্রয়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ , আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং

বাংলাদেশসহ দ . এশিয়ার প্রোগ্রাম এবং বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন হয়েছে ।

যুক্তরাজ্যের ফরেন , কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের ( এফসিডিও ) এশিয়া - প্যাসিফিক অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক প্রধান জন ওয়ারবারটন বলেন , দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবিকা , জনস্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে । তাঁর মতে , এটি একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সংকট , যা মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য । প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছে ব্রিটিশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত রেজিলিয়েন্ট এশিয়া

অ্যান্ড রিকভারি ও সিটি রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম । বিশ্বব্যাংকের মতে , দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন শহরে ইতিমধ্যে হিট অ্যাকশন প্ল্যান , নগর সবুজায়ন , আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি - সাশ্রয়ী শীতলীকরণ প্রযুক্তি ইতিবাচক ফল দিচ্ছে । তবে এসব উদ্যোগ বড় পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সরকারি- বেসরকারি বিনিয়োগ । দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে সরকারগুলোর বর্তমান সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে , দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলো ভবিষ্যতেও কর্মসংস্থান , উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে থাকবে , নাকি তীব্র তাপপ্রবাহ উন্নয়নের গতিকে মন্থর করে দেবে ।