বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দেশের অর্থনীতিতে ঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিলেও মুনাফা অর্জনে রেকর্ড সৃষ্টি করছে। এক বছরে তাদের ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে বৈদেশিক বাণিজ্য, এলসি কমিশন, ফি ও বিভিন্ন চার্জ থেকে আয় বাড়ায় কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। একই সময়ে দেশে পুনর্বিনিয়োগ কমলেও বিদেশে মুনাফা পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে। যা বিদেশি ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক কৌশল ও বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী অর্থায়নে তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিদেশি ব্যাংকগুলোর এই দ্বিমুখী ব্যবসায়িক চিত্র।
সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট ঋণ ও অগ্রিম কমে দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে পুনর্বিনিয়োগ করা আয় ৪ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা থেকে কমে ২ হাজার ৯৬ কোটি টাকায় নেমে এলেও বিদেশে পাঠানো মুনাফা বেড়ে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের শুধু দ্বিতীয়ার্ধে ৫৬২ কোটি টাকা লভ্যাংশ বিদেশে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের বিশেষ সমীক্ষা ও প্রকল্প বিভাগ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম: প্রবণতা এবং পরিচালনাগত পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
মোট ঋণের ৫২ শতাংশ শিল্প খাতে এবং ২০ শতাংশ ব্যবসা ও বাণিজ্যে গেছে। কনজিউমার ফাইন্যান্সের অংশ ১৬, অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ৮ এবং অন্যান্য খাতে ৪ শতাংশ। শিল্প খাতে ঋণ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ২২ হাজার ৭৮০ কোটি থেকে বেড়ে ২৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিপরীতে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ ১৫ হাজার ৬৮৯ কোটি থেকে কমে ৯ হাজার ১১০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ৭২৬ কোটি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যদিও এ খাতে মোট অংশ এখনো তুলনামূলক ছোট, তবে এটি উৎপাদনশীল ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর বাড়তি আগ্রহের ইঙ্গিত বহন করে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, তা ২০২৫ সালের জুনে ৬ দশমিক ১ শতাংশে ওঠে এবং ডিসেম্বর শেষে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে এই হার এখনো অধিকাংশ দেশীয় ব্যাংকের তুলনায় কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের ওপর দাবি মোট সম্পদের ২২ এবং সরকারি খাতের ওপর দাবি ১৩ শতাংশ। বিদেশি সম্পদের পরিমাণ বেড়ে ১৭ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা হয়েছে, যা মোট সম্পদের ৬ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে মোট দায়ের মধ্যে আমানতের অংশ ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। বিদেশি দায় বেড়ে ১০ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা হয়েছে। মূলধন ও সঞ্চিতি ১৫ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা, যা মোট দায়ের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যালান্স শিটের সম্পদের ৫৬ শতাংশের বেশি এবং দায়ের ৬২ শতাংশের বেশি ‘অন্যান্য’ হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ, যা মূলত অফ-ব্যালান্স শিট বা সম্ভাব্য সম্পদ ও দায়ের বিপরীত এন্ট্রি। এটি ইঙ্গিত করে যে বিদেশি ব্যাংকগুলো স্থানীয় ঋণ সম্প্রসারণের তুলনায় উচ্চমাত্রার তারল্য ধরে রাখছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো হেলাল আহমেদ জনি বলেছেন, ঋণ বিতরণে ধারাবাহিক সংকোচন এবং মোট ব্যাংক খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর বাজার অংশীদারত্ব কমে যাওয়া নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন আরও বাড়ানো এবং করপোরেট গ্রাহকের পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাময় খাতে অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবদান আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার ও প্রভিশন কভারেজের পরিবর্তনের ওপর নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।