Image description

দেশের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, চলমান পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী কয়েক সপ্তাহে রপ্তানি আদেশ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ বাড়বে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্যাস-সংকটের ১৪ দিন পার হলেও আগামী ৮ আগস্টের আগে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরেই শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগে থেকেই অনেক টেক্সটাইল মিল ৩০-৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছিল; নতুন সংকটে সেই অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নিটিং, ডাইং, ওয়াশিং, কম্প্যাক্টিং ও ফিনিশিং ইউনিট। কারণ, এসব প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন টানা ও নির্দিষ্ট চাপের গ্যাস, যা দিনের দীর্ঘ সময় অনেক এলাকায় মিলছে না।

শিল্পমালিকদের ভাষ্য, সংকট এখন আর শুধু উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়ায় একটি অর্ডারের প্রতিটি ধাপে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কখন গ্যাস থাকবে, কখন থাকবে না—তা নিশ্চিত না হওয়ায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী উৎপাদন সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। অনেক কারখানায় রাতের দিকে কিছুটা গ্যাসচাপ বাড়লে তখন উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে শ্রমঘণ্টা, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আজকের পত্রিকাকে বলেন, গ্যাস-সংকট ইতিমধ্যে প্রায় দুই সপ্তাহ অতিক্রম করেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, তাতে আগামী ৮ আগস্টের আগে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। এতে মাসের প্রায় তিন সপ্তাহই কার্যত উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁর আশঙ্কা, সব মিলিয়ে এতে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে অনেক কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধও চাপে পড়তে পারে।

বর্তমান সংকটের মূল কারণ কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট থেকে নেমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে চলে এসেছে। অন্যদিকে দেশের দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে জাতীয় চাহিদার বড় অংশই অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী ও চট্টগ্রামের গ্যাসনির্ভর শিল্পাঞ্চল। টেক্সটাইল খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপের পরিবর্তে মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ৩ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এই চাপ দিয়ে ডাইং ও প্রসেসিং ইউনিট স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

গ্যাস-সংকটের মধ্যে উৎপাদন সচল রাখতে অনেক কারখানা সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে বিকল্পভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ও বিধিমালার কারণ দেখিয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সেই সরবরাহও বন্ধের নির্দেশ দেয়। ফলে উৎপাদন অব্যাহত রাখার শেষ ভরসাটিও সংকটে পড়ে। এ অবস্থায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর দাবি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প এ ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। তাদের মতে, এতে অন্তত সময়মতো কিছু রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন কম দামে উৎপাদনের চেয়ে সময়মতো পণ্য সরবরাহ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময় পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা সহজেই ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন। এতে তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা কমার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ইতিমধ্যে অনেক রপ্তানিকারক নির্ধারিত সময় রক্ষা করতে ব্যয়বহুল এয়ার শিপমেন্টের কথাও ভাবছেন। এতে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।। শিল্পমালিকদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে এয়ার শিপমেন্টে ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমিয়ে দেবে।

উৎপাদন কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারেও। অনেক কারখানায় ওভারটাইম সীমিত করা হয়েছে, নতুন নিয়োগ স্থগিত রয়েছে। তবে উৎপাদন কমলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংকঋণের কিস্তি, কারখানা ভাড়া এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। ফলে আর্থিক চাপ দ্রুত বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। ফলে এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস-সংকটের প্রভাব কারখানার গণ্ডি পেরিয়ে পুরো অর্থনীতিতেই পড়ে। তাঁর ভাষায়, এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।