Image description
মজুত শেষ হবে ১২ থেকে ১৩ বছরে

দেশে গ্যাসের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ২২টি ক্ষেত্রে (গ্যাস ফিল্ড) এখন মজুত আছে মাত্র ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে ১২ থেকে ১৩ বছরেই এই মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে। গ্যাসের এই মজুত দিয়ে চাহিদার অর্ধেকও মেটানো যাচ্ছে না; বরং স্থানীয় ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রতিদিন কমছে। এ অবস্থায় আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে দেশের জ্বালানি খাত। বছরে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করেও চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের অভাবে একদিকে যেমন নতুন বিনিয়োগ থমকে আছে, অন্যদিকে চালু কারখানাগুলো বন্ধের উপক্রম। তারা বলছেন, বিগত ১৫-২০ বছরে গ্যাস খাতের উন্নয়নে গোছানো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। সময়মতো ভূমি ও সাগরে কূপ খননের গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; বরং অবহেলিত রাখা হয়েছে এ খাতকে। তাই গ্যাসের অভাবে এখন ডুবতে বসেছে দেশের অর্থনীতি। দ্রুত সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা না গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশে ভয়াবহ জ্বালানি বিপর্যয় নেমে আসবে।

জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শিল্পকারখানায় গ্যাসের নতুন সংযোগের জন্য বছরের পর বছর আবেদন পড়ে আছে ১ হাজার ৮৫৭টি। এর মধ্যে ৪-৫ বছর আগে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে বসে আছে ৫৫০টি শিল্পকারখানা। বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের অন্যতম বাধা গ্যাস সংকট।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, গ্যাস খাত নিয়ে বসে থাকার এক দিনও সময় নেই। তিনি বলেন, ভূখণ্ডে গ্যাসের বড় ধরনের মজুত পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই সরকার সাগরে গত মাসে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডেকেছে, তা যে কোনোভাবে সফল হতে হবে। নতুবা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৫ বছরে ভূখণ্ডে ৩০টি কূপ খনন করে খুব বেশি গ্যাস পাওয়া যায়নি। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস এসেছে মাত্র ১২ কোটি ৫৩ লাখ ঘনফুট। অথচ প্রতিবছর গ্যাসের উৎপাদন কমছে ১৩ কোটি ঘনফুট।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যুগান্তরকে বলেন, গ্যাসের সংকট অব্যাহত থাকলে চালু কারখানাগুলোও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্যাসের সরবরাহ না বাড়লে এবং নতুন সংযোগ দেওয়া না হলে দেশে আর কোনো শিল্পকারখানা হবে না। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনবে।

বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্রের অবস্থা : দেশে ২২টি ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে ২৯ দশমিক ৭৪ টিসিএফ। ষাটের দশকের পর থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২২ দশমিক ১১ টিসিএফ। এখন বাকি আছে ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ। প্রতিবছর ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুট বা দশমিক ৭ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয় স্থানীয় ২২ ক্ষেত্র থেকে। এই ২২ ক্ষেত্রের সবকটির অবস্থা শোচনীয়, অর্থাৎ উৎপাদন কমছে। সরকারি সর্ববৃহৎ ক্ষেত্র তিতাসে একসময় গ্যাস উৎপাদন হতো দৈনিক ৫৪ কোটি ঘনফুটের বেশি। সেখানে এখন হচ্ছে ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট। বাখরাবাদে একসময় ৪ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হলেও এখন হচ্ছে মাত্র ১ কোটি ৮৬ লাখ ঘনফুট। সিলেট ক্ষেত্র থেকে একসময় দৈনিক ১ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হলেও এখন হচ্ছে মাত্র ৬০ লাখ ঘনফুট। দেশের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস ক্ষেত্র বিবিয়ানা। এর অপারেটর মার্কিন কোম্পানি শেভরন। এতে একসময় দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হলেও এখন হচ্ছে মাত্র ৭৫ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। আশঙ্কার বিষয় হলো, মজুত না থাকায় রূপগঞ্জের ক্ষেত্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। আর সুন্দলপুর ক্ষেত্রের উৎপাদন যে কোনো সময় বন্ধ হতে পারে। সুন্দলপুরে এখন দৈনিক গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১১ লাখ ঘনফুট।

সরকারি ১৮টি ক্ষেত্রে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন হয় ৭২ কোটি ৮২ লাখ ঘনফুট। আর আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি শেভরন ও ক্রিস এনার্জির ৪ ক্ষেত্রে গ্যাস উৎপাদন হয় ৯২ কোটি ২৫ লাখ ঘনফুট। এই ৯২ কোটির মধ্যে শেভরন একাই উৎপাদন করে দৈনিক ৮৮ থেকে ৮৯ কোটি ঘনফুট।

১৫০ কূপ কর্মসূচির ফলাফল কী : দেশে গ্যাসের মজুত বাড়াতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১০০টি কূপ খননের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এখন সেই কর্মসূচি আরও বাড়িয়ে ১৫০ কূপ করার পরিকল্পনা চলছে। ইতোমধ্যে ৩০টি কূপ খনন হয়ে গেছে। এতে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার মতো। এসব কূপ থেকে এ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে মাত্র ১২ কোটি ৫৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, কূপের এই ফলাফল বেশ হতাশাজনক। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০২৯ সালে দেশীয় ক্ষেত্রের উৎপাদন ১৬০ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট থেকে কমে ১৪০ কোটিতে নামতে পারে। তখন গ্যাসের সরবরাহ না বাড়ালে শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এর আগে ২০২৭-২০২৮ সালে দেশে গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক ২৫৭ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে।

২০১৮ সালে ভোলায় মাঝারি আকারের একটি ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। এরপর আর কোনো ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। ভোলায় ২ থেকে ৩ টিসিএফ গ্যাস মজুত আছে বলে মনে করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্স। সেই গ্যাসও সরকারের খুব বেশি কাজে লাগছে না। কারণ, ভোলা থেকে মূল ভূখণ্ডে কোনো পাইপলাইন না থাকায় ওই ক্ষেত্রের সব গ্যাস ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাসের চাহিদা আছে। সরবরাহ করা হয় দৈনিক ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে ১১০ কোটি ঘনফুট।

স্বল্প মেয়াদে সমাধান কী : পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী রোববার যুগান্তরকে বলেন, গ্যাসের মজুত বাড়াতে আপাতত দেশীয় ক্ষেত্রে কূপ খননের সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তাই কোথাও কোনো গ্যাস পাওয়া গেলে তার পাশে আরও গ্যাসের সন্ধানে নতুন নতুন কূপ খনন করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলা বলছে, ১৫০ কূপ খনন এবং তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসানো গেলে ২০২৯ সালের শেষে বা ২০৩০ সালে ৩১৩ কোটি থেকে ৩৪৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া যাবে।

এদিকে মাতারবাড়ীতে এফএসআরইউ বসানোর কাজ পেতে যাচ্ছে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিএনইই)। চীন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি জিটুজির আওতায় সিএনইইকে এই টার্মিনাল বসানোর কাজ দিতে যাচ্ছে জ্বালানি বিভাগ। সিএনইইকে তৃতীয় এফএসআরইউ-এর কাজ দেওয়ার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনার জন্য জ্বালানি বিভাগের প্রস্তাব মঙ্গলবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদন হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন কোম্পানি শেভরন এক প্রস্তাবে বলেছে, মার্কিন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) আছে। সেই চুক্তির আওতায় তারা নতুন করে ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকে (মূলত বৃহত্তর সিলেট এলাকায়) কাজ করার সুযোগ পেলে সম্ভাবনাময় বিভিন্ন গ্যাস কাঠামোতে কূপ খনন করবে। এতে কয়েক বছরে আরও ৫ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কার সম্ভব। ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ব্যয় কমবে ১৮০ কোটি ডলার। তবে সরকার এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।