পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার ও এ সংক্রান্ত অভিযোগের দুর্বল তদন্ত, কম দণ্ড এবং অর্থ উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য না আসায় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে। এ কারণে আগামী বছর এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)-এর চতুর্থ দফার পারস্পরিক মূল্যায়ন (মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন) সামনে রেখে এখন থেকেই সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে সরকার। কারণ এই মূল্যায়নে দুর্বল অবস্থান (নন-কমপ্লায়েন্ট) শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের বিষয় নয়, এর প্রভাব দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক ঋণ, এমনকি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও পড়তে পারে।
জানা গেছে, মূল মূল্যায়নের আগে আগামী ১১ থেকে ১৩ আগস্ট ঢাকায় আসছে এপিজি সেক্রেটারিয়েটের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। এটি হবে ‘প্রি-মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্ল্যানিং ভিজিট’ বা পারস্পরিক মূল্যায়নের আগের পরিকল্পনা সফর। এতে তারা বাংলাদেশের প্রস্তুতি, দুর্বলতা, সমন্বয় ব্যবস্থা এবং বাস্তব সক্ষমতা যাচাই করবে।
আগামী ১২ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় সমন্বয় কমিটি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বা এফআইডি সচিবের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কিং কমিটির সঙ্গে প্রতিনিধিদলের নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-কে পুরো মূল্যায়নের লিড এজেন্সি এবং বিএফআইইউ প্রধানকে চিফ কো-অর্ডিনেটর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থায়ও নির্ধারণ করা হয়েছে ফোকাল পারসন।
এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এবার এপিজি শুধু আইন দেখবে না। তারা দেখবে আইন কতটা কার্যকর হয়েছে। সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত হয়েছে কি না, মামলা হয়েছে কি না, আদালতে দণ্ড হয়েছে কি না এবং পাচার হওয়া সম্পদ বাস্তবে জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করা গেছে কি না-এসবের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চাইবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপিজির মূল্যায়ন মূলত এফএটিএফের (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয়। কোনো দেশ দুর্বল বা নন-কমপ্লায়েন্ট হিসাবে চিহ্নিত হলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো সেই দেশের সঙ্গে লেনদেনে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করে। বাড়ে করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিংয়ের খরচ, আমদানি-রপ্তানির এলসি খুলতে জটিলতা তৈরি হয়, বৈদেশিক ঋণের ব্যয় বাড়ে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এপিজির মূল্যায়নে কোনো দেশের অবস্থান দুর্বল হলে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো-আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোও তখন ওই দেশের আর্থিক ঝুঁকি নতুন করে মূল্যায়ন করে।
এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এপিজির পারস্পরিক মূল্যায়ন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন নয়, এটি একটি দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের বৈশ্বিক সার্টিফিকেট। ইতোপূর্বে বাংলাদেশ ভালো ফল করেছিল বলেই আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও বাণিজ্যে আমাদের অবস্থান শক্তিশালী ছিল। তিনি আরও বলেন, যদি এবার বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ে বা গ্রে-লিস্টের মতো ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো বাড়তি করেসপন্ডেন্ট চার্জ আরোপ করবে। এলসি খোলা ব্যয়বহুল হবে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমবে এবং দেশের ক্রেডিট রেটিংও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জানা গেছে, ‘কমপ্লায়েন্ট’ অবস্থান ধরে রাখতে এখন সর্বাত্মক প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, দুদক, পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে এখন চলছে জোর সমন্বয়। শুধু আইন সংশোধন নয়, তদন্ত, বিচার, সম্পদ জব্দ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর দৃশ্যমান সাফল্য দেখানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে উচ্চপর্যায় থেকে। সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের বিষয়টি এবার সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কামনা করবেন। বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সহায়তা ছাড়া বিপুল পরিমাণ পাচার হওয়া সম্পদ ফেরানো সম্ভব নয় সরকারি পর্যায়ে এমন উপলব্ধিই এখন জোরালো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান সম্প্রতি যুগান্তরকে বলেন, সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলো অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এপিজি ও এফএটিএফের মূল্যায়নে আসল বিষয় হবে কার্যকারিতা। তারা দেখতে চাইবে কতটি বড় অর্থ পাচারের ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে, কতটি মামলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে, কতজন অপরাধী সাজা পেয়েছেন এবং কত সম্পদ বাস্তবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী এক বছর হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ আইন প্রণয়ন নয়, বাস্তব ফলাফলই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে নতুন কৌশল : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্স বর্তমানে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বড় অর্থ পাচার মামলার অগ্রগতি তদারকি করছে। ইতোমধ্যে দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ ফ্রিজ বা ক্রোক করা হয়েছে। তবে সরকার বুঝতে পেরেছে, সম্পদ জব্দ করাই শেষ কথা নয়, বিদেশি আদালতের মাধ্যমে তা দেশে ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য বিশ্বের ১২টি আন্তর্জাতিক আইন ও ফরেনসিক অডিট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের আটটি বাণিজ্যিক ব্যাংক চুক্তি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান ‘নো রিকভারি, নো ফি’ ভিত্তিতে কাজ করবে। অর্থাৎ সম্পদ উদ্ধার না হলে তাদের কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না। এছাড়া মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি কমাতে নগদ লেনদেন নিরুৎসাহিত করে ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারেও জোর দেওয়া হচ্ছে। ‘বাংলা কিউআর’সহ বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের ডিজিটাল ট্রেইল তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। মূল্যায়নের প্রস্তুতির অংশ হিসাবে সরকার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ দ্রুত শেষ করছে। এগুলো হলো-মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, বিধ্বংসী অস্ত্রের অর্থায়ন, অলাভজনক সংস্থা (এনজিও/এনপিও) এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ভার্চুয়াল অ্যাসেট। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এসব মূল্যায়নের অগ্রগতি ইতোমধ্যে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হবে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় কৌশলপত্র প্রকাশ করা হবে।