Image description

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাল হয়েছে। এসব ভিডিও রিলে উঠে এসেছে নারী নির্যাতনের বীভৎস কিছু দৃশ্য। কোনো সুস্থ মানুষ এসব ভিডিও দেখে স্বাভাবিক থাকতে পারে না। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, নারীর প্রতি এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে ঘরেই। পোশাক শিল্পের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি ম্যানেজারের ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, এ ধনাঢ্য ব্যক্তি তার শিশু কন্যার সামনেই তার স্ত্রীকে মধ্যযুগীয় কায়দায় পেটাচ্ছে। একটি সভ্য সমাজে এ ধরনের পৈশাচিকতা কল্পনাতীত। কিন্তু তিন সন্তানের জনক এ মানুষরূপী পশু তেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে প্রতিনিয়ত এরকম অমানবিক আচরণ করছে তার স্ত্রীর সঙ্গে। নির্যাতনের শিকার হয়ে নারী ডিভোর্সের নোটিস দেওয়ার পরও তাকে হয়রানি করা হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে হুমকি।

বহুজাতিক পোশাক প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি ম্যানেজারের পারিবারিক নৃশংসতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার এক দিন আগে নির্যাতনের শিকার এক মডেল গণমাধ্যমে তার ওপর এক ব্যবসায়ীর বিভৎসতার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় অবস্থিত একটি বেসরকারি হাসপাতালে বিজ্ঞাপনের চুক্তির কথা বলে ডেকে নিয়ে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন মডেল ও অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরী। এ ঘটনায় তিনি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন। জানা গেছে, বিজ্ঞাপনের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রলোভন দেখিয়ে স্নিগ্ধা চৌধুরীকে হাসপাতালে ডাকা হয়। সেখানে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। অভিযোগকারী দাবি  অনুযায়ী, নির্যাতনের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তাকে ভয়ভীতি দেখান। অভিনেত্রীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটি দেশের একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর হওয়ার কারণে ঘটনার পরপরই তিনি মামলা করতে সাহস পাননি। এতে তার ব্যক্তিজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি প্রথমে আইনি পদক্ষেপ নেননি। পরে তিনি খিলক্ষেত থানায় গিয়ে মামলা করার উদ্যোগ নেন।

দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটি সহজ সমীকরণ পাওয়া যায়। এদেশে নারীরা এখন ঘরে-কর্মক্ষেত্রে কোথাও নিরাপদ নয়। নারীদের জন্য আমাদের রাস্তাঘাট নিরাপদ নয়, পাবলিক প্লেস নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। অর্থাৎ, এ সমাজে আজ কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়।

উদ্বেগের বিষয় হলো, আগে নারী নির্যাতন এবং নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাগুলো বেশির ভাগই ঘটত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে। কিন্তু এখন উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত এবং এলিট শ্রেণির মধ্যে নারী নির্যাতনের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধনাঢ্য ব্যক্তির যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তাতে ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করেছেন, তার স্বামী তাকে অন্যের সঙ্গে অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন। এ ভুক্তভোগী নারী সাহসী। তিনি সাহস করে সত্যি কথা বলেছেন। কিন্তু এখন সমাজে উঁচু মহলে এ ধরনের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। লোকলজ্জার ভয়ে, সামাজিক মানমর্যাদার কারণে অনেক নারী এসব নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করেন না। নীরবে সহ্য করে নিজেকে নিঃশেষ করেন। অতিরিক্ত অর্থ লোভ, মাদকের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং পারিবারিক অনুশাসনের অভাবের কারণে সমাজে উচ্চবিত্তের মধ্যে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে।

পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি ক্ষুদ্র ইউনিট। রাষ্ট্র এবং সমাজের যে আবহ থাকে সেটার রিফ্লেকশন হয় পরিবারে। আমরা দেখছি যে, সমাজে নানা ধরনের হিংসা-বিদ্বেষমূলক ঘটনার প্রসার ঘটছে। এগুলোর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কাজেই এসব কিছুর প্রভাব প্রতিটি পর্যায়ে পড়ছে। যার ফলে সহিংসতার মাত্রাটা ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে। মাদকের প্রভাব, সমাজে একটা অস্থিরতা, কর্মসংস্থানের অভাব, দারিদ্র্য, অপসংস্কৃতির প্রসার, নারীবিদ্বেষের প্রসার, সহিংসতা প্রসার, বিচারহীনতা-যার সবকিছুর প্রভাব পড়ছে সমাজে ও রাষ্ট্রে। যার ধাক্কাটা এসে পড়েছে পরিবারে। তাই পরিবার আক্রান্ত হচ্ছে। এভাবে পারিবারিক সহিংসতা সমাজ ও রাষ্ট্রের চেহারাটাকে উন্মুক্ত করছে। যারা সমাজপতি যারা রাষ্ট্রের নায়ক তারা এদিকটায় দৃষ্টি না দিলে এ সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।

আমাদের সমাজে বিচারহীনতার ফলে যে একটা সহিংসতার পরিবেশ গড়ে উঠেছে, সে অপরাধ প্রবণতার রিফ্লেকশন আমরা পারিবারিক সহিংসতায় দেখতে পাচ্ছি। নানা কারণে মানবিক গুণাবলি লোপ পেয়ে যাচ্ছে। যতই আধুনিক সমাজের দিকে আমরা এগোচ্ছি, ততই সেটা প্রকট আকার ধারণ করছে। সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার বা মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে। ড্রাগ, গ্যাং কালচার আধুনিকায়নেরই বাই প্রডাক্ট। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে পরকীয়া, স্বামী স্ত্রীর অবিশ্বাস, সাইবার বুলিং বাড়ছে। পারিবারিক সম্পর্ক ও বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে সবার অজান্তে। ফলে নারী হয়ে যাচ্ছে আরও অসহায়, নিরাপত্তাহীন। যেকোনো নারীকে যে কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নোংরা, অশালীন এবং আপত্তিকর ভাষায় আক্রমণ করছে। এআই দিয়ে তার অশালীন ছবি পোস্ট করে তার জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে।

সব মিলিয়ে, নারীর আর্তনাদ, হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসে ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস। গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন ৮৭.০৭ শতাংশ নারী। এর মধ্যে ৮১.০৬ শতাংশ মানসিক, ৫৩.০২ শতাংশ অর্থনৈতিক, ৩৬.০৫ শতাংশ যৌন, আর ৬৪.০৬ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেন। ঘটনাগুলো চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকে। এ কারণেই অনেক সংসারে অশান্তি দেখা দিচ্ছে। এ অশান্তি সমাজেও ছড়িয়ে পড়ছে। নারীদের আত্মহত্যা বা বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনাও ঘটে থাকে।

এসব পরিসংখ্যান বলে দেয়, নারীরা ভালো নেই, শান্তিতে নেই, স্বস্তিতে নেই। শুধু নারী হওয়ার অপরাধে প্রতিমুহূর্তে নিরাপত্তার ঝুঁকিতে বসবাস করা কোনো সভ্য দেশের দৃষ্টান্ত হতে পারে না। এ কি আদৌ সভ্য সমাজ, যেখানে দুধের শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত নারীরা ধর্ষণের শিকার হতে পারেন যেকোনো মুহূর্তে? যে কেউ যেকোনো সময়ে নারীর পথ আগলে দাঁড়াতে পারে। পরিধেয় বস্ত্র ধরে টানাহেঁচড়া করতে পারে। অশ্রাব্য গালি দিতে পারে, ধর্ষণ করতে পারে। অথচ এ কাজগুলো যারা করে, সেই পুরুষগুলোই আমাদের সমাজে নারীদের বিচারের মানদণ্ড নিয়ে বসে থাকে।

সহিংসতা প্রতিরোধে ‘পারিবারিক-সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০’ থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ নেই। আইনটির মূল লক্ষ্য তাৎক্ষণিক শাস্তির চেয়ে সুরক্ষা প্রদান। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে বাজেট ও লোকবলের অভাবে এটি সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা পরিচিত হতে পারেনি। ফলে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। তবে সরকার সম্প্রতি আইনটির কিছু সংশোধনী আনার উদ্যোগ নিয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তায় ১০৯ হেল্পলাইন সক্রিয় রয়েছে।

মাঠপর্যায়ে কাজ করা সংস্থাগুলো মনে করে, আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোগ খুব জরুরি। ‘নাগরিক উদ্যোগ’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়ার্ড পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব তৈরি এবং স্থানীয় ‘সালিশ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার কাজ করছে। কারণ বেশির ভাগ নারী আইনি জটিলতায় না গিয়ে সংসার টিকিয়ে রেখে কেবল নির্যাতন বন্ধ করতে চান।

পারিবারিক সহিংসতা রোধে কেবল আইন দিয়ে শতভাগ সফলতা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমাজের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গণমাধ্যমে নারীর ইতিবাচক উপস্থাপন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ছাড়া এ নির্মমতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।

তবে আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আন্তরিক। ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই বিএনপি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। গত বছর দেশব্যাপী নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলোর তথ্য সংগ্রহ, নিপীড়িত নারী ও শিশুর আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা দেওয়ার জন্য সেল গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। সরকার গঠনের পর, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, নির্বাচনি ইশতেহারে নারী ও শিশু সুরক্ষার সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী নারী শিক্ষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মাদক প্রতিরোধে খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড উৎসাহিত করছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ কেবলমাত্র সরকারের দায়িত্ব নয়। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন। সেটা করতে হবে আমাদের সবাইকে।