খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)-এর ‘জরুরি’ কাজের নামে টেন্ডার ছাড়া শতাধিক কাজ ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে। যা নিয়ে সাধারণ ঠিকাদারের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কেসিসি’র বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে নজিরবিহীন এসব অনিয়মে সরকারি অর্থ লুটপাটের তথ্য মিলেছে। মানবজমিনের হাতে আসা নথিপত্র এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত তিন মাসে কেসিসি’র শতাধিক জরুরি মেরামত ও উন্নয়ন কাজ কোনো প্রকার টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি প্রশাসক নিজ ক্ষমতায় নেতাকর্মীদের মাঝে ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়েছে। কেসিসি প্রশাসক ও মহানগর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল নেতারা ভিন্ন ভিন্ন লাইসেন্স ব্যবহার করে এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন।
অভিযোগ ওঠেছে, কাজগুলোর সিংহভাগেরই মান অত্যন্ত নিম্নমানের, যার ফলে এই সংস্কার কাজগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জরুরি কাজের জন্য বিধি অনুযায়ী কোটেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ব্যয় ৫ লাখ টাকার নিচে হলে এ ধরনের কাজ করা হয়। এর আগে কেসিসি’র বিভিন্ন জরুরি কাজ এভাবে করা হয়েছে। এবার এই ‘সুযোগ’টি নিচ্ছেন প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর অনুসারীরা।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর সোনাডাঙ্গা) আসনে বিএনপি প্রার্থী ছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এ আসনে তিনি পরাজিত হন। নির্বাচনের পর গত ২২শে ফেব্রুয়ারি নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন শুরু হয়। ইতিমধ্যেই অর্ধশত প্যাকেজের কাজের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। কার্যাদেশের অপেক্ষায় রয়েছে সমপরিমাণ। জরুরি মেরামতে কাজের আবেদন জমা রয়েছে আরও প্রায় ৬০টির মতো।
কেসিসি’র হিসাব বিভাগের সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বিভিন্ন ধাপে ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা থোক বরাদ্দ পায় খুলনা সিটি করপোরেশন। এডিপি’র থোক বরাদ্দের টাকা দিয়েই এসব কাজ করা হচ্ছে।
কেসিসি একাধিক সূত্র জানায়, বিধি অনুযায়ী কোটেশনের জন্যও তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাজের দর আহ্বান করা হয়। সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, কাজের অনুমোদনের সময় প্রশাসক বলে দেন কাজটি কে করবেন। তখন ওই ব্যক্তি তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স এনে নিজেই দর সাজিয়ে জমা দেন। কোটেশনের সব কাজ এভাবেই দেয়া হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, এর আগে অন্য মেয়ররা এডিপি’র থোক বরাদ্দের টাকা ভাগ করে স্কিম জমা দিতে বলতেন। সব কাজই দরপত্রের মাধ্যমে হয়েছে। থোক বরাদ্দের টাকায় ব্যাপক হারে কোটেশনে কাজ করানো এবারই প্রথম। এভাবে ব্যাপক হারে কোটেশনের মাধ্যমে কাজের ভাগ বাটোয়ারা নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
জানা গেছে, নগরীর মতিয়াখালী খালপাড় সংস্কারের জন্য গত ১৪ই মে নিউ নীরব এন্টারপ্রাইজকে ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেয়া হয়। সময়মতো কাজটি শেষ হয়েছে। এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, কাজটি বাস্তবায়ন করছেন খুলনা মহানগর যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হাসান নাসিম। তিনি প্রকাশকের অনুসারী।
নগরীর টুটপাড়া তালতলা হাসপাতালের পাশে বায়তুশ শরফ জামে মসজিদের পাশাপাশি দু’টি গলি সম্প্রতি মেরামত করা হয়েছে। মসজিদ লেনের প্রথম অংশের ব্যয় ছিল ৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। মেসার্স অন্তু এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বাস্তবে কাজটি করেছেন খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক তানভীর ইসলাম অয়ন।
তালতলা হাসপাতালের পাশে মসজিদ লেনের দ্বিতীয় অংশের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে লোকমান এন্টারপ্রাইজের নামে। এই কাজের ব্যয় ছিল ৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, কাজটি করেছেন খুলনা মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জি এম রাজিবুল ইসলাম বাপ্পী। বাপ্পী ও অয়ন দু’জনই প্রশাসকের অনুসারী।
টুটপাড়া মেইন রোড বাইলেন ও ড্রেন উন্নয়ন কাজের কার্যাদেশ ছিল মেসার্স তন্দ্রা এন্টারপ্রাইজের নামে। কাজটি করেছেন মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন। চানমারী ডা. আলতাফ হোসেন রোড বাইলেন মেরামতের কার্যাদেশ মেসার্স ফয়সাল ট্রেডার্সের নামে। ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ের কাজটি করেছেন ৩০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলম হাওলাদার। নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুলতান আহমেদ রোড বাইলেন উন্নয়নের কার্যাদেশ দেয়া হয় মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশনকে। কাজটি করেছেন ওয়ার্ড বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া হোসেন লিটন। একই ওয়ার্ডে প্রফেসর রোকন উদ্দিন সড়ক বাইলেনের কার্যাদেশ দেয়া হয় আরোশ কনস্ট্রাকশনকে। এই কাজ করেছেন ওয়ার্ড বিএনপি নেতা মাসুদ রেজা। তারা দু’জনেই প্রশাসক মঞ্জুর অনুসারী।
লবণচরা ইব্রাহিম মিয়া মাদ্রাসার পাশে কাঠের ব্রিজের কাজটি করেছেন ৩১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসলাম হোসেন। এই কাজের কার্যাদেশ ছিল আলী আজমান এন্টারপ্রাইজের। দাদা ম্যাচ কাদেরী জামে মসজিদের অজুখানা মেরামতের কার্যাদেশ ছিল সিয়াম এন্টারপ্রাইজের নামে। মসজিদ কমিটির পক্ষে কাজটি করেছেন ওয়ার্ড বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম সম্পাদক পারভেজ আহমেদ।
মেসার্স রাফসান এন্টারপ্রাইজ নামে পাবলা ফোরকানীয়া মাদ্রাসা জামে মসজিদ মেরামত। কাজটি করছেন জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কামরান হোসেন। সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা নার্গিস আলীর জামাই শেখ মোটর অ্যান্ড মেশিনারিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান একাধিক কাজ নিয়েছে। মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মাহবুব হাসান পিয়ারু রাইয়ান এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স রিফাত এন্টারপ্রাইজের নামে লিলিয়ান পার্কের মেরামত দু’টি প্রায় ১০ লাখ টাকার কাজ নিয়েছে।
এ ব্যাপারে মহানগর বিএনপি’র সভাপতি ও কেডিএ চেয়ারম্যান এডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনা বলেন, টেন্ডার ছাড়া এভাবে ঠিকাদারি কাজ ভাগ বাটোয়ারার সুযোগ নেই। প্রশাসক যদি এ কাজ নিজে করে- সেই দায় তার। এখানে আমার কিছু বলার নেই। তবে, নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, জরুরি কাজের জন্য ছোট ঠিকাদারদের দিয়ে কাজগুলো করানো হচ্ছে। বড় ঠিকাদাররা ছোট কাজ করতে চান না। সেভাবেই অন্যের লাইসেন্সে ছোট ঠিকাদাররা কাজগুলো করেছেন। যারা কাজগুলো করছেন তারা অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারা ব্যবসা করতেই পারে। সব নিয়ম মেনে কাজ দেয়া হয়েছে।