Image description

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নসংক্রান্ত নানা বাধা পেরিয়ে অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন)।

প্রায় ৮০০ একর জমির এই শিল্পাঞ্চলের গ্রাউন্ডব্রেকিং অনুষ্ঠান আজ সোমবার অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের প্রত্যাশা, এই প্রকল্প ঘিরে অন্তত ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসবে এবং সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে চীনা বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ সিইআইজেড কম্পানি লিমিটেডের যৌথ আয়োজনে আনোয়ারায় অনুষ্ঠেয় অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধান অতিথি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ সিইআইজেড কম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ানসহ দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই গ্রাউন্ডব্রেকিং শুধু একটি শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজ শুরুর আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার হওয়ার পর এই প্রকল্প ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগের মাধ্যমে।

২০১৪ সালে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন প্রকল্পটি অগ্রসর হয়নি। শুরুতে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানির সঙ্গে আলোচনা হলেও পরে ২০২২ সালে চীনা সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করে। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেজা ও সিআরবিসির মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি বিনিময়ের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি নতুন গতি পায়।

একই সফরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ মোংলা বন্দরের পাশে নতুন চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) চীনের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রচার সংস্থা চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের (সিসিপিআইটি) সঙ্গে বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে।

কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের ২২ কোটি ডলারের বিনিয়োগও এই সফরের অন্যতম সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বেজার তথ্য মতে, আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য সরকার চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট থেকে আসবে। প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, জেটি সংযোগ সড়ক ও সেতু, চার লেনের সড়ক, ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাস ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

সরকারের প্রত্যাশা, এই অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে রপ্তানিমুখী শিল্পায়নে নতুন গতি আসবে। বস্ত্র, প্রযুক্তিনির্ভর তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, তথ্য-প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, মেডিক্যাল ডিভাইস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ উচ্চমূল্য সংযোজনকারী বিভিন্ন শিল্প এখানে গড়ে উঠবে।

বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পটি অনুমোদনের পর পাঁচ বছরে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও প্রথম তিন বছরের মধ্যেই অন্তত ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট কারখানা স্থাপনের জন্য প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

চীনা বিনিয়োগের প্রবণতাও এখন বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভূমি ইজারা চুক্তি করেছে, যার সম্ভাব্য বিনিয়োগ ৭১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানই চীনা মালিকানাধীন বা চীনা যৌথ উদ্যোগের, যাদের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রায় ৪৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। পোশাক খাতের বাইরে ড্রোন, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, কপার পণ্য, মেডিক্যাল ডিভাইস, লজিস্টিকস ও হাইড্রোপনিক প্রযুক্তিতেও চীনা বিনিয়োগ বাড়ছে।

বিডা জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৯২১ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে বলে আশা করছে সরকার।

আনোয়ারাজুড়ে উৎসবের আমেজ

চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনকে ঘিরে আনোয়ারাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্পায়নের নতুন দ্বার খুলছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে আনোয়ারা সরাসরি চট্টগ্রাম নগরী ও জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কয়েক কিলোমিটার দূরেই রয়েছে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ফলে কাঁচামাল আমদানি, প্রস্তুত পণ্য রপ্তানি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বিশেষজ্ঞদের যাতায়াত অনেক সহজ হবে। এই কৌশলগত অবস্থানই চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকল্পটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে শুধু আনোয়ারা নয়, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কর্ণফুলী টানেল, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। স্থানীয় তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং অঞ্চলটি শিল্পায়নের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিন উদ্দীন বলেন, এটি আনোয়ারাবাসীর জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির নতুন যুগের সূচনা করবে।