রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও বঙ্গভবন সূত্র কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছে—‘তিনি যেকোনো সময় পদত্যাগ করবেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শিগগির পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন—কয়েক দিন ধরে এমন আলোচনার প্রেক্ষাপটে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন তা নিয়ে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা এবং রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম এ ক্ষেত্রে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
দলীয় সূত্র জানায়, দলের অনুগত এবং দুঃসময়ের কাণ্ডারি হিসেবে তাঁকেই বিবেচনা করা হচ্ছে পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুলের ইতিবাচক মনোভাব এবং বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি তাঁকে সর্বজন গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
মির্জা ফখরুল ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি, ড. আব্দুল মঈন খান এমপি ও নজরুল ইসলাম খানের নামও আলোচনায় রয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের দলের প্রতি আনুগত্য, দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি কমিটমেন্ট রয়েছে। কমিটমেন্ট রয়েছে। দলের বাইরে অরাজনৈতিক ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর নামটিও দলের হাইকমান্ডের তালিকায় রয়েছে বলে দলীয় একটি সূত্র জানায়।
সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদের একজন প্রভাবশালী সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি নামই আছে। আপাতত বিকল্প ভাবা হচ্ছে না। দলের আর বিকল্প নেই।’
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রপতির যোগাযোগ নিয়ে যেসব সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, সেগুলো নাকচ করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব সংবাদের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। এগুলো গল্পকাহিনি। পৃথিবী এখন এত ছোট হয়ে গেছে যে ফোন করার জন্য লন্ডন যেতে হয় না। এখান থেকেই যে কেউ কথা বলতে পারেন। মানুষ গল্প বানাচ্ছে।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম এমপি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। এগুলো সব গুজব।’
মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে অথবা একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে কে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, তা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এমপি বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি, রাজনীতি করব। দল বিপদে পড়লে আবার দাঁড়াব। এটিই আমার ধর্ম, এটিই করব। দলে আমি কোনো পজিশনে থাকি বা না থাকি, রাজনীতি করি, দেশ বিপর্যয়ে পড়লে, দল বিপর্যয়ে পড়লে আবার সামনের কাতারে দাঁড়াব।’
নতুন রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমি কোনো কর্তৃপক্ষও নই। নতুন রাষ্ট্রপতি যিনি আসবেন তাঁর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই অবগত আছেন। উনার বিভিন্ন মাধ্যম আছে, সব তথ্য উনার কাছে আছে। বাইরে থেকে বলার কিছু নেই।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি চাইলে সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে পারেন। স্বাস্থ্যগত অথবা যেকোনো কারণে সেটা করার অপশন আছে। তবে আমরা সেটা জানি না।’
তিনি বলেন, ‘গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। ঘটনা যদি হয়, তাহলে আমরা দেখব।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। আর সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কিছু বলা হচ্ছে না। আপনারা পত্রিকায় দেখেছেন এবং গুঞ্জন শুনছেন, সেটা আমিও শুনেছি।’
এদিকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই আজ দুপুরে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরছেন। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, আগামী রবিবার তাঁর ফেরার কথা ছিল। সে সময়সূচি এগিয়ে আনা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন, “সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে—‘রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ক্ষেত্রমত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত, কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করিবেন।”
এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে সেটি পূর্ণ করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
দেশে ১৯৯১ সালে সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হওয়ার পর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮ অনুসারে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান চালু হয়। তবে এই বিধান চালু হওয়ার পর থেকে মাত্র একবার রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছিল। ওই সময় বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে। নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস বিজয়ী হন। পরবর্তী সময়ে প্রতিবারই একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এবার ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার কথা।
উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় এবং দলটি নিজেদের পছন্দের কাউকে রাষ্ট্রপতি করার সুযোগ পায়।