Image description

সেবা প্রসারের লক্ষ্যে প্রশাসনের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন জনবল কাঠামো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সেবা সম্প্রসারণ ও বিশেষায়িত কার্যক্রম পরিচালনায় অতিরিক্ত জনবল অপরিহার্য বলে মনে করে সরকার।

নতুন পদ সৃষ্টি, বিদ্যমান পদের পুনর্বিন্যাস, নিয়োগ বিধিমালা চূড়ান্তকরণ এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে পাওয়া সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারি রাজস্ব খাতে অন্তত ৪২৭টি নতুন পদ যুক্ত হতে পারে। এসব পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে সরকারের প্রশাসন আরো সম্প্রসারিত হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

সর্বশেষ জাতীয় সংসদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে বর্তমানে মোট পাঁচ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬৮ হাজার ৮৮৪টি প্রথম শ্রেণি, এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯টি দ্বিতীয় শ্রেণি, এক লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি তৃতীয় শ্রেণি এবং এক লাখ ৭৮ হাজার ৭৩টি চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, বর্তমানে সরকারি অফিসগুলোতে মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২, যার মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এসব পদে জনবল নিয়োগ দিয়ে জনসাধারণের জন্য শতভাগ সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কমিটির প্রথম সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে জনবল নিয়োগ সংক্রান্ত অন্তত ১৩টি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। সরকার মনে করে, এই বিপুলসংখ্যক সরকারি পদ খালি রেখে প্রশাসনের পক্ষে জনসাধারণকে শতভাগ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এসব প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো নতুন পদ সৃষ্টি, বিদ্যমান পদের পুনর্বিন্যাস, নিয়োগ বিধিমালা চূড়ান্তকরণ এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো নির্ধারণ। প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, এগুলো বাস্তবায়িত হলে সরকারি রাজস্ব খাতে অন্তত ৪২৭টি নতুন পদ যুক্ত হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘সরকারি পরিষেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই, যা সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার।

প্রশাসনে দক্ষ জনবল সৃষ্টি, শূন্য পদ পূরণ, সরকারি জনবল কাঠামো ও সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রশাসনের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর জন্য একটি সচিব কমিটি রয়েছে। এই কমিটি কাজ করছে। কমিটির সুপারিশ পেলে প্রশাসন সম্প্রসারণের জন্য করণীয় নির্ধারণ করবে সরকার। সেই সুপারিশে নতুন জনবল নিয়োগ বা শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সরকারের প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় গবেষণা, তথ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবেলা, শিক্ষা ও সামাজিক সেবায় জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে; অন্যদিকে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টাও রয়েছে। রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি নতুন পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজন, ফলপ্রসূতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়এই তিনটি বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করবে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত ৪২৭টি পদের মধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে আটটি শান্তি নিবাসের জন্য ৭২টি স্থায়ী পদ ও আটজন খণ্ডকালীন চিকিৎসকসহ মোট ৮০টি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সেন্টার ফর নেভাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিএনআরডি) জন্য ৫২টি, সরকারি করা ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্তীকরণের লক্ষ্যে ৬০টি, কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের গুদাম ও স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশনের জন্য ৩৯টি এবং সেইফার প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ইমার্জেন্সি রেসপন্স কন্ট্রোল সেন্টারের জন্য ৩০টি, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ১৫টি, পায়রা বন্দরের জন্য চারটি এবং বগুড়া ও নওগাঁ সড়ক বিভাগের জন্য ৩২টি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এনএপিডির আইসিটি শাখা, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের ১৭টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় স্থাপত্য অধিদপ্তরের আটটি আউটসোর্সিং পদের পরিবর্তে সেগুলো রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাব বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানেও কয়েকটি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে। সচিব কমিটির সভায় বিষয়টি অনুমোদনের পরে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। ক্যাবিনেটের অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে এসব পদ পূরণের উদ্যোগ নেবে সরকার।

একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের জনবল বৃদ্ধি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং সেখান থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পরপরই ২৬ ফেব্রুয়ারি ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ।

এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পুলিশের জনবল বাড়ানোর জন্য সরকার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কনস্টেবল ছাড়াও পুলিশ সার্জেন্টের ১৮০টি শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা ও যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে এই নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) এবং বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নিয়োগের বিষয়টিও বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের বর্তমান ব্যয় সংকোচনের নীতি অনুসরণের সময় রাজস্ব খাতে একের পর এক নতুন পদ সৃষ্টি দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর স্থায়ী আর্থিক চাপের সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের মতে, নতুন প্রতিটি পদ মানেই বেতন-ভাতা, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা সুবিধা এবং অবসরের পর পেনশনসহ বিশাল আর্থিক দায়।

তবে সচিবের পদমর্যাদায় সাবেক রেক্টর আউয়াল মজুমদার মনে করেন, প্রশাসনের এই সম্প্রসারণের নেপথ্যে সরকারি জনবল কাঠামো ও সেবা সম্প্রসারণের যৌক্তিকতা থাকলেও বর্তমানে ব্যয় সংকোচনের নীতি অনুসরণের সময়ে রাজস্ব খাতে একের পর এক নতুন পদ সৃষ্টি দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর স্থায়ী আর্থিক চাপের সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে তা স্থবির হয়ে পড়ে। তাই জনবল বাড়ানো মানেই অপচয় নয়, বরং সঠিক ব্যবস্থাপনার অধীনে দক্ষতা বাড়ানোই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন তিনি।