বহুল আলোচিত এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এর পরিবর্তে বাংলাদেশ পুলিশের অধীন সম্পূর্ণ নতুন একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হচ্ছে, যার নাম রাখা হয়েছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ফোর্সেস/ব্যাটালিয়ন’ (এসআরএফ/এসআরবি)।
এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২৯ জুলাই সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় ও অংশীজন সভায় খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করা হতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের র্যাব-১ শাখা থেকে ১৩ জুলাই জারি করা নোটিসের সূত্রে এসব জানা গেছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন একটি আইন তৈরির মাধ্যমে শুধুই নামের পরিবর্তন হচ্ছে, কার্যত নতুন নামেই চলবে পুরোনো র্যাব।
সিনিয়র সহকারী সচিব মাসফিকা হোসেন স্বাক্ষরিত ওই নোটিসে জানানো হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুসংহত করা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখার লক্ষ্যেই এ নতুন বাহিনী গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় ওই সভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন, ভূমি, অর্থ, লেজিসলেটিভ বিভাগসহ পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, কারাগার ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যেসব কারণে র্যাব বিলুপ্তির জাতীয় দাবি ও আন্তর্জাতিক সুপারিশ জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নির্বিচার গুমখুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনে তাদের ট্র্যাক রেকর্ড। যার সঙ্গে ছিল পুলিশ ও সেনাসদস্যদের একাংশের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি ও নিরাপত্তা সংস্থার সহায়ক, অংশীদারি ও সুরক্ষাকারী ভূমিকা।’
তিনি বলেন, ‘এ প্রেক্ষাপটে শুধু র্যাবের নাম পরিবর্তন বা প্রতিকার কমিটি ইত্যাদির মধ্যে সংস্কার সীমিত থাকলে কোনো বাস্তব সুফল পাওয়া যাবে না। র্যাবের অপকর্মের সহায়ক শক্তি তথা এ সংস্থার জন্মলগ্ন থেকে দেশে দীর্ঘকাল লালিত রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের অপব্যবহারের সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা এবং ভিন্নমত দমনের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অপব্যবহার স্বাভাবিকতা পেয়েছে তার মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া কোনো বাস্তব ও টেকসই সুফল প্রত্যাশা করা কঠিন। বিশেষ করে র?্যাব ও তার সহায়ক সব সংস্থার মৌলিক চারিত্রিক সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অর্পিত ক্ষমতার প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাদের “জবাবদিহিহীন এলিটিস্ট” মানসিকতা ও চর্চা পরিহার করার কার্যকর উপায় অনুসন্ধান করা। আইন যে তাদের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উভয়ের নিজেদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, এ মূল্যবোধ বিকশিত করতে হবে। যার মূল দায়িত্ব যতটুকু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের, তার চেয়ে বেশি দেশের রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক-প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রকদের ওপর।
তা ছাড়া র?্যাব সংস্কার তখনই অর্থবহ হবে যখন এই প্রতিষ্ঠান ও তাদের সহায়ক শক্তিসমূহের কৃতকর্মের জন?্য প্রত?্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী সবার দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাবে।’
পুলিশের অধীনেই নতুন কাঠামো : ‘স্পেশাল রেসপন্স ফোর্সেস/ব্যাটালিয়ন (এসআরএফ/ এসআরবি) আইন, ২০২৬’ শীর্ষক খসড়া বিলে বলা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্সের অধীনে গঠিত র?্যাব বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন এ বাহিনীটিও একটি সশস্ত্র ও ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’ হিসেবে গণ্য হবে, তবে এটি সরাসরি কাজ করবে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে।
বাহিনীর প্রধান হবেন একজন মহাপরিচালক, যিনি পুলিশ বাহিনীর অন্যূন অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (অ্যাডিশনাল আইজিপি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা হবেন। পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) আদেশ ও নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে মহাপরিচালক এ বাহিনী পরিচালনা করবেন, তবে এর সার্বিক তত্ত্বাবধান থাকবে সরকারের হাতে। সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়।
থাকছে পুরোনো ক্ষমতা, যুক্ত হচ্ছে জবাবদিহি : খসড়া আইন অনুযায়ী, নতুন বাহিনী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, সন্ত্রাস ও সাইবার অপরাধ দমন ও মানব পাচার রোধে কাজ করবে। পূর্বসূরি র্যাবের মতোই এ বাহিনীর সদস্যদেরও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে (যেমন সন্ত্রাসবাদ বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ) ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিনা পরোয়ানায় প্রবেশ, তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
তবে অতীতের বিতর্ক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ মাথায় রেখে খসড়ায় কঠোর জবাবদিহিমূলক কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে, অভিযোগ প্রতিকার কমিটি। নাগরিকের অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দূর করতে একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি থাকবে। এ কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং আইজিপি মনোনীত একজন মানবাধিকার বা আইনি বিশেষজ্ঞ (ন্যূনতম ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন) থাকবেন। এ কমিটি স্বাধীন অনুসন্ধান দল গঠন ও দেওয়ানি আদালতের মতো সাক্ষী তলবের ক্ষমতা পাবে। আরেকটি হলো থানায় সোপর্দ। নতুন বাহিনীর কোনো সদস্য গ্রেপ্তার ব্যক্তি বা জব্দ আলামত নিজেদের হেফাজতে না রেখে অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় সোপর্দ করতে বাধ্য থাকবেন।
আরও রয়েছে সদস্যদের শাস্তি। হেফাজতে নির্যাতন, দুর্ব্যবহার, বলপূর্বক অর্থ আদায় বা ক্ষমতার অপব্যবহারকে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
সূত্র জানান, আইনটি পাস হলে র্যাবের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, তহবিল, ব্যাংক হিসাব ও নথিপত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরিত হবে। বর্তমানে র্যাবে কর্মরত সব কর্মকর্তা ও সদস্য আগের শর্তেই নতুন বাহিনীর সদস্য হিসেবে চাকরিতে বহাল থাকবেন।
নাম পরিবর্তন বনাম কাজের ধরন : বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ : ২০০৪ সালে গঠনের পর থেকে জঙ্গি ও অপরাধ দমনে ভূমিকা রেখে প্রশংসিত হলেও পরবর্তীতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে র্যাব। ২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ বাহিনী ও এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ পটভূমিতে খসড়া আইনে জবাবদিহির বাড়তি কাঠামো তৈরি করা হলেও বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের মতো ব্যাপক ক্ষমতা বহাল রাখায় বাহিনীটির কার্যকারিতা ও মানবাধিকারের বিষয়টি নিয়ে সংশয় কাটছে না বিশেষজ্ঞদের। র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী গঠনের এ উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘মূল সমস্যা নামে নয়, বরং বাহিনীর কর্ম ও আচরণে। র?্যাবের যেমন বহু ভালো কাজ আছে, তেমন বিগত দিনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের কারণে বাহিনীটির বিরুদ্ধে অসংখ্য বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। তাই নাম পরিবর্তন করলেও যদি কাজের ধরন না বদলায়, তবে বাহিনীটি বিতর্ক ও অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবে না। র?্যাবকে বিতর্কিত অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
২৯ জুলাইয়ের সভায় অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এ খসড়াটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে আইনের ধারায় আরও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।